স্মৃতি যাদের ভালো তারা সব যায়গায় সফল। আজ আমি তোমাদের এমন ১০ টি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল বিষয় জানাবো যেসব অভ্যাসের মাধ্যমে ব্রেইন পাওয়ার বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকরী হবে। আর জানাবো যার কারণে তোমার ব্রেইনের বারোটা বেজে যাচ্ছে। অর্থাৎ তোমার ব্রেইনে যে সক্ষমতা বা ইফেক্টিভিটি বা ইউটিলাইজেশন তুমি করতে পারতে, সেটা তো করতেই পারছো না; বরং উল্টা দিকে নিজেকে ধ্বংস করে ফেলছো।
এই দশটা অভ্যাসের কথা এবং এদের কারণে আমাদের ব্রেইনের কতটা বার্নআউট হচ্ছে, কতটা ড্যামেজ হচ্ছে, কিভাবে পচে যাচ্ছে। সেটা শুধু আমি বলছি না, বরং গবেষণা ও সায়েন্টিফিক স্টাডির পারফরম্যান্স ধরে ধরে তোমার সাথে তুলে ধরবো।
স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল
আমাদের কাছে অনেকেই প্রশ্ন করে ভাই কীভাবে ব্রেইন পাওয়ার বাড়ানো যায় বা স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। আসলে এটি আল্লাহ প্রদত্ত একটি নেয়ামত। আল্লাহ সবাইকে একই রকমের ব্রেন দিয়েছেন একই মাপের। কেউ এটিকে ইউটিলাইজ করে জীবনে উন্নতি সাধন করে।
মস্তিস্ককে কাজে লাগিয়ে মানুষ মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণা যেমন করছে তেমনটি সমুদ্রের অতল গভীরে কি আছে তা নিয়ে গবেষণা করছে। এই স্মৃতি বৃদ্ধির কিছু বৈজ্ঞানিক কৌশল আছে। আজকের আলোচনায় আমরা সেই বিষয়ে জানবো।
১. পর্যাপ্ত ঘুম

আমাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল সমূহের মধ্যে প্রথমেই রাখছি পর্যাপ্ত ঘুম। অনেকেই মনে করে, আমি যদি কম ঘুমাই তাহলে ইলন মাস্ক হয়ে যাবো। অনেক কাজ করতে পারবো। কিন্তু সায়েন্স বলছে একদম উল্টো কথা। যারা কম ঘুমায়, তাদের প্রোডাক্টিভিটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২০২৪ সালে প্রকাশিত UCS Neurology জার্নালে দেখা গেছে। যারা নিয়মিত ৬ ঘণ্টার কম ঘুমায়, তাদের মেমোরি রিটেনশন লেভেল যারা নিয়মিত ঘুমায় তাদের তুলনায় ৪০% কমে যায়।
অর্থাৎ তোমার মেমোরির ৬০% ক্ষমতা টিকে থাকে, বাকি ৪০% হারিয়ে যায় কম ঘুমানোর কারণে। তাই কম ঘুমানোর আগে ভেবে দেখো। তুমি কি তোমার মেমোরি ১০০% ব্যবহার করতে চাও, নাকি মাত্র ৬০%?
আরও পড়ুনঃ কথা বলার ৫টি কৌশল যাতে শ্রোতা মুগ্ধ হতে বাধ্য!
২. রাত জাগার অভ্যাস পরিত্যাগ করা

অনেক ছেলেমেয়ে সারা বছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষার আগের রাতে সারারাত জেগে পড়ে বা আড্ডা দেয়, ভাবছে পরের দিন সব করে ফেলবে। কিন্তু যারা সারারাত ধরে কাজ করে, তারা পরের দিন কোনো ক্রিয়েটিভ বা কার্যকর শেখা করতে পারে না।
১০ টি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল এর মধ্যে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী কৌশল। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশনে লাফিয়ে উঠে ফোন খুলে ফেলে। দিনে ৭০-৮০ বারের বেশি ফোন খোলে। এতে মনোযোগ ভেঙে যায়। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, আরভিন-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে — একটি নোটিফিকেশন দেখার পর মনোযোগ ফিরে পেতে গড়ে ২৩ মিনিট সময় লাগে।
আর যারা ভারীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের অ্যাটেনশন স্প্যান কমে গিয়ে মাত্র ৮ সেকেন্ডে নেমে আসে। যা গোল্ডফিশের চেয়েও কম।
৩. ঘুমানোর সময় মোবাইল না দেখা
তোমার শরীর থেকে হৃদপিণ্ড সরানো যায়, কিন্তু হাত থেকে মোবাইল ফোন সরানো যায় না! ঘুমাতে যাওয়ার আগে লাইট বন্ধ করে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক।
মোবাইলের ব্লু রে তোমার চোখে এসে ঘুমের হরমোন কমিয়ে দেয়, যার ফলে ঘুম বিলম্বিত হয় ১ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। যারা শুয়ে শুয়ে মোবাইল ইউজ করে, তাদের ঘুম পূর্ণ হয় না, প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়, মনোযোগ নষ্ট হয়।
BNC Psychiatry-র ২০১৯ সালের এক স্টাডিতে দেখা গেছে — যারা ঘুমানোর আগে নিয়মিত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশনের প্রবণতা ৫০% বেশি।
আরও পড়ুনঃ এআই জেনারেলিস্ট হওয়ার বিস্তারিত গাইড লাইন
৪. মাল্টিটাস্কিং পরিহার করা
স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল তালিকায় ৪ নম্বরে বলবো মাল্টি টাস্কিং পরিহার করতে। অনেকে একসাথে চার-পাঁচটা কাজ করতে গিয়ে ভাবে, “আমি খুব ব্যস্ত” কিন্তু আসলে কিছুই ঠিকমতো হয় না। লন্ডন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে। যারা মাল্টিটাস্কিং করে, তাদের IQ গড়ে ১৫ পয়েন্ট কমে যায়।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে। বারবার কাজ পরিবর্তন (context switch) করা মানুষদের প্রোডাক্টিভিটি ৪০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।
অতএব, একসাথে অনেক কিছু না করে একটিমাত্র কাজে ফোকাস করো। সেটাতেই সাফল্য আসবে।
৫. অতিরিক্ত চিন্তা ত্যাগ করা
অতিরিক্ত চিন্তা ত্যাগ করা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল সমূহের মধ্যে অন্যতম। অনেকেই শুধু চিন্তা করে যায়, কিন্তু কাজে নামতে পারে না। একে বলে “overthinking”। ইয়েল ইউনিভার্সিটির এক স্টাডিতে দেখা গেছে। যারা অতিরিক্ত চিন্তা করে, তাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা কমে যায়।
২০০৭ সালের Psychological Science-এর একটি আর্টিকেল অনুযায়ী। যারা অতিরিক্ত চিন্তা করে, তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা কমে যায় এবং জীবনের সন্তুষ্টি গড়ে ৯৪% ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় কম হয়।
৬. জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা
যারা সিঙ্গারা, সমুচা, কাচ্চি, ভাজা-পোড়া, বার্গার, পিজা, কোক। এসব নিয়মিত খায়, তারা নিজেদের ব্রেইন নষ্ট করছে। গবেষণায় দেখা গেছে। যারা নিয়মিত জাঙ্ক ফুড খায়, তাদের মেমোরি রিটেনশন ২৮% পর্যন্ত কমে যায়।
তাই তুমি যদি নিজের ব্রেইন দ্রুত ধ্বংস করতে চাও, তাহলে নিশ্চিন্তে জাঙ্ক ফুড খেতে থাকো! আর যদি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে জাঙ্কফুড বাদ দিতে পারো ফলাফল নিজেই দেখতে পাবে।
বিশেষ নিবন্ধঃ এইচএসসি আইসিটির সাজেশন – ৮ মিনিটে পুরো প্রস্তুতি
৭. পিয়ার প্রেসার
স্কুল, কলেজ বা ভার্সিটিতে অনেকেই আশেপাশের বন্ধুদের মতো হতে গিয়ে ভুল পথে যায়। কেউ ধূমপান করছে, কেউ মাদক নিচ্ছে — “আমি একবার ট্রাই করি” বলে শুরু করে ফেলে।
ন্যাশনাল স্টাডি অফ ড্রাগ অ্যাবিউজ অনুযায়ী, যারা ড্রাগে জড়িয়ে পড়ে, তাদের ৯৪%-ই ১৮ বছরের মধ্যে শুরু করে। নিউরোসাইকোফার্মাকোলজির ২০১৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে। টিনএজে স্মোকিং শুরু করলে ব্রেইনের ফাংশনাল ভলিউম কমে যায়।
৮. অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা overconfidence অনেক সময় ক্ষতিকর। কেউ ভাবে, “আগে পারতাম, এখনও পারবো”— ফলে অনুশীলন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু যারা প্র্যাকটিস করে না, তাদের নিউরোপ্লাস্টিসিটি কমে যায়।
২০১৮ সালের Educational Review-এর স্টাডিতে দেখা গেছে। যারা নিয়মিত প্র্যাকটিস করে না, তারা অন্যদের তুলনায় গড়ে ৩০% কম স্কোর করে।
৯. কমফোর্ট জোন থেকে বেড়িয়ে আসা
কমফোর্ট জোন মানে হলো- শুধু সেই কাজ করা, যেটা করতে পারো। নতুন কিছু শেখার চেষ্টা না করা। এতে কোনো গ্রোথ আসে না। তাই স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল এর ৯ নম্বরে রেখেছি কমফোর্ট জোন থেকে বেড়িয়ে আসার বিষয়টি।
MIT-এর ২০১৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে – যারা নিয়মিত নতুন চ্যালেঞ্জ নেয়, তাদের ক্রিয়েটিভ সলিউশন দেওয়ার ক্ষমতা ৭০% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
১০. ব্রেইনকে একটিভ রাখা
ব্রেন বুষ্টিং বা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল আলোচনা সবার শেষে বলবো সব সময় ব্রেনকে একটিভ রাখতে হবে। অনেকে ভাবে, “ব্রেইন তো আল্লাহ দিয়েছেন, যেমন আছে তেমনই থাকবে।” কিন্তু এটা রক্ষণাবেক্ষণ ও অনুশীলন ছাড়া কার্যকর থাকে না।
তোমাকে পর্যাপ্ত ঘুম দিতে হবে (৭–৮ ঘণ্টা), স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, জাঙ্ক ফুড ও কোল্ড ড্রিংক থেকে দূরে থাকতে হবে, এবং ইতিবাচক মানুষদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে।
যারা নেতিবাচক, অলস বা ড্রপআউট – তাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটালে তোমার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৩৫% বেড়ে যায়।
তাই নিজেকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাখো, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করো। তোমার ব্রেইনটাকে কাজে লাগাও, খারাপ অভ্যাসগুলো দূরে রাখো, এবং নিজের পটেনশিয়ালকে কাজে লাগাও।


2 Comments
Pingback: কার্যকরী সময় ব্যবস্থাপনার জন্য ৪টি টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল - 4 Effective Time Management Principles - NiceTrix
Pingback: চাকরি নাকি উচ্চশিক্ষা কোনটি আগে করবেন? - Job vs Higher Study: 1 Powerful Choice can Shapes Your Future Success - NiceTrix