কার্যকরী সময় ব্যবস্থাপনা না করতে পারলে ক্যারিয়ারে গ্রোথ আনা সম্ভব নয়। আজকে আমি এমন কিছু সিস্টেম নয়, বরং এমন কিছু টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল নিয়ে কথা বলব যা একচুয়ালি কাজ করে। বিশ্বাস করুন আপনি যদি এগুলো সঠিকভাবে ফলো করতে পারেন, তাহলে আপনার কাছে এই সময় ব্যবস্থাপনা আর কোনো জেলখানা মনে হবে না। বরং এটা মনে হবে, এটা আপনার নিজেরই তৈরি করা একটি সিস্টেম।
আমি যদি টাইম ম্যানেজমেন্টকে আরেকটু বিস্তৃতভাবে বলি, তবে এটি হচ্ছে পার্সোনাল টাইম ম্যানেজমেন্ট। পুরো শব্দটার শুরুতেই রয়েছে ‘পার্সোনাল’; অর্থাৎ এটা আপনার নিজের, ব্যক্তিগত।
সংক্ষেপে টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল
আজকের এই Time Management Principals বা পার্সোনাল টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল আয়োজনে ৪টি মেজর বিষয় নিয়ে জানাবো যেগুলো আপনার ফোকাস ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে সারাদিনকে কাজে লাগানোর মাষ্টার প্লান হিসেবে কাজ করবে-
- ১. গভীর ফোকাস (Deep Focus)
- ২. কার্যক্ষমতা (Efficiency)
- ৩. গ্রোথ (Growth)
- ৪. ফ্লেক্সিবিলিটি (Flexibility)
আমার দেখানে এই সময় ব্যবস্থাপনা কৌশলগুলো ব্যবহার করে আপনাকে আপনার সময় ব্যবস্থাপনাকে ব্যক্তিগত এবং সুনির্দিষ্ট করে তুলতে হবে। এই প্রিন্সিপালগুলোকে আপনার মতো করে সাজিয়ে, সেই আকারে আপনি আপনার সময়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
যাদের স্মৃতি শক্তি দূর্বল তারা ১০ টি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির কৌশল ফলো করতে পারেন। কারন সময় ব্যবস্থাপনায় স্মৃতি শক্তি বা মেমোরি পাওয়ার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি কাজ। কথা না বাড়িয়ে, চলুন মূল আলোচনা শুরু করা যাক।
গভীর ফোকাস (Deep Focus)
প্রথম প্রিন্সিপাল হলো, অবশ্যই, ফোকাস (Focus)। ফোকাস ছাড়া আমরা সময় নিয়ে যত কাজই করি না কেন, সেটা আসলে কার্যকর হয় না। কারণ, যে কাজে ফোকাস নেই, সেটা আপনার কাজই হলো না।
তাই আমাদের প্রয়োজন ডিপ ফোকাস। ঠিক টাইমটাতে, ঠিক কাজের ওপর। ফোকাস করার জন্য আপনাকে কী কী নীতি অনুসরণ করতে হবে?

১. প্রায়োরিটি লিস্ট ও এমআইটি (MIT)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি প্রায়োরিটি লিস্ট তৈরি করা। আপনার হাতে আজকের দিনে পাঁচটা কাজ রয়েছে, কিন্তু সবগুলোর প্রায়োরিটি একই নয়। তাই আপনাকে একটি তালিকা তৈরি করে, টপ প্রায়োরিটি কাজ (Most Important Task – MIT) দিয়ে শুরু করতে হবে।
২. এনার্জি সিঙ্কিং এর মাধ্যমে ফোকাস টাইম খুঁজে বের করা
এই জায়গায় আমি একটু থামব। অনেকেই দিনের প্রথম কাজ হিসেবে MIT রাখেন। কিন্তু ধরুন, আপনি আমার মতোই মর্নিং পার্সন নন। সকালে উঠে আপনার ব্রেনের ইঞ্জিন স্টার্ট হতে সময় লাগে। যদি আজকের Most Important Task (যেমন: জটিল বিশ্লেষণ, পেপার লেখা) সকালে করি, যদিও এটা আমার ১ নম্বর প্রায়োরিটি— তবুও আমি সেটা করতে পারব না। কারণ আমার মেন্টাল এনার্জি (Mental Energy) তখন পূর্ণ থাকে না।
আমাদের সবারই এনার্জি এবং মোটিভেশনের একটি দৈনন্দিন ওঠানামা থাকে। দিনের শুরুতে, মাঝখানে বা একদম রাতে- আপনি সবসময় একরকম অনুভব করবেন না।
সমাধান: আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে আপনার মোটিভেশন ও এনার্জির দৈনিক ওঠানামাটা কেমন। যদি মনে হয় আপনি মিড-ডে (১২টা-১টার দিকে), বা বিকেল ৩টা-৫টা, কিংবা সন্ধ্যা ৭টা-৯টার মধ্যে সবচেয়ে ফোকাসড থাকেন, তবে ওই সময়েই আপনার Most Important Task করবেন।
To-do list বা Priority list সবারই থাকে, কিন্তু সেটার সঙ্গে আপনার নিজস্ব এনার্জি ও মোটিভেশনের ওঠানামা সিঙ্ক করতে হবে। যদি আপনি এটা করতে পারেন, তবেই আপনি আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ডিপ ফোকাস করতে পারবেন।
৩. মাল্টিটাস্কিং বাদ দিয়ে সিরিয়াল টাস্কিং করুন
আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মাল্টিটাস্কিং (Multitasking) একদম করা যাবে না। আমরা ভাবি “এই কাজটা করতে করতে একটা ম্যাসেজের উত্তর দিয়ে নিই,” কিন্তু এতে আপনার মস্তিষ্কের ফোকাস শিফট হয়।
কম্পিউটারের RAM-এর মতোই, আপনার মস্তিষ্কের এনার্জি ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ফলে আপনি আগের কাজে ফিরলেও আগের মতো মোমেন্টাম পান না। তাই মাল্টিটাস্কিং বন্ধ করে দিন। এর বদলে ব্যবহার করুন সিরিয়াল টাস্কিং– অর্থাৎ একটার পর একটা কাজ শেষ করুন।
আমার বিশ্বাস এই তিনটি কাজ করতে পারলে, আপনি আপনার সময়ের ফোকাস ধরে রাখতে পারবেন। আমার পাঠকের তালিকায় যারা প্রোগ্রামার আছেন তাদের Competitive Programming এর জার্নিটা শুরু Problem Solving এর মাধ্যমে! শুরু করতে পারেন।
কার্যক্ষমতা (Efficiency)
এখন আমরা যাব কার্যক্ষমতা বা এফিশিয়েন্সিতে। এফিশিয়েন্সি মানে হলো আপনি কত কম সময়ে কত বেশি কাজ করতে পারেন। এখানেও আমি ৪টি টাইম ম্যানেজমেন্ট প্রিন্সিপাল এর কথা বলবো যাতে আপনার কার্যক্ষমতা (Efficiency) বাড়বে।

১. প্যারেটো প্রিন্সিপাল (Pareto Principle) বা ৮০/২০ রুল
কার্যক্ষমতার প্রথম প্রিন্সিপাল হলো প্যারেটো প্রিন্সিপাল (৮০/২০ রুল)। অর্থাৎ, আপনার যেকোনো কাজের ৮০ শতাংশ ফলাফল আসে ২০ শতাংশ প্রচেষ্টা থেকে।
যেমন: পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সিলেবাসের ৮০% কাভার করতে লাগে ২০% সময়, আর বাকি ২০% শেষ করতে লাগে বাকি ৮০% সময়। তাই বেশি ফল পেতে হলে প্রথম ৮০ শতাংশেই ফোকাস করুন।
২. ব্যাচিং (Batching)
একই ধরনের কাজগুলো একসাথে করাকে বলে ব্যাচিং। যেমন, দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে (টাইম ব্লকে) সব ইমেইলের উত্তর দেওয়া, ফিডব্যাক পাঠানো বা কল করা। এতে বারবার ফোকাস নষ্ট হবে না এবং মূল্যবান সময় বাঁচবে।
৩. পারকিনসন’স ল (Parkinson’s Law) মেনে চলুন
পারকিনসন’স ল বলে: “Work expands to fill the time available for its completion।” আপনি কোনো কাজের জন্য ১০ ঘণ্টা সময় দিলে, সেটা ১০ ঘণ্টাই নেবে। কিন্তু ৩ ঘণ্টা দিলে, সেটা ৩ ঘণ্টাতেই শেষ হবে।
সমাধান: বড় কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিজের জন্য ছোট ডেডলাইন (Self-imposed deadlines) ঠিক করুন।
৪. পারফেকশনিজমকে বিদায়
পারফেকশনিজম টাইম ম্যানেজমেন্টের শত্রু। কাজ ৮০ শতাংশ ভালোভাবে সম্পন্ন করা ১০০ শতাংশ পারফেক্ট করার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। পারফেকশনিজম এড়িয়ে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব।
গ্রোথ (Growth) ও উন্নতি
শুধু কাজ করলেই হবে না, কাজের মাধ্যমে গ্রোথ (উন্নতি) দরকার।
১. আইজেনহাওয়ার ম্যাট্রিক্স (Eisenhower Matrix) ব্যবহার
এর জন্য আইজেনহাওয়ার ম্যাট্রিক্স সম্পর্কে জানা জরুরি। এটি একটি ২x২ মডেল:
- Important/Not Important
- Urgent/Not Urgent
যেসব কাজ Important কিন্তু Not Urgent—সেগুলোই আসল গ্রোথ তৈরি করে। যেমন: নতুন স্কিল শেখা, সিভি আপডেট করা, বিদেশে আবেদন প্রস্তুত করা ইত্যাদি। এই ঘরে যত বেশি সময় দেবেন, তত বেশি উন্নতি হবে।
ফ্লেক্সিবিলিটি (Flexibility)
সবশেষে আসি ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা। টাইম ম্যানেজমেন্ট যেন জেলখানা না হয়। খুব কঠোর রুটিনে বেঁধে ফেললে জীবনের আনন্দ হারিয়ে যায়।
রুটিন থাকা দরকার, কিন্তু সেটা যেন জীবনের নমনীয়তা নষ্ট না করে। নিজের পছন্দের কাজ, বিশ্রাম এবং বিনোদনের জন্য সময় রাখতে হবে।
মনে রাখবেন, কাজের পরে বিশ্রাম হোক পুরস্কার হিসেবে, কাজের আগে নয়।
তাহলে আপনি অনুভব করবেন— “হ্যাঁ, আমি আজকের কাজগুলো করেছি, এখন বিশ্রামটা আমার প্রাপ্য।”
উপসংহার
যদি এই সব প্রিন্সিপালগুলো (ফোকাস, এফিশিয়েন্সি, গ্রোথ ও ফ্লেক্সিবিলিটি) অনুসরণ করতে পারেন, তাহলে আপনার সময় ব্যবস্থাপনা হবে কার্যকর, উৎপাদনশীল এবং আনন্দদায়ক। ধন্যবাদ এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য।


1 Comment
Pingback: চাকরি নাকি উচ্চশিক্ষা কোনটি আগে করবেন? - Job vs Higher Study: 1 Powerful Choice can Shapes Your Future Success - NiceTrix