ইউরোপে স্থায়ীভাবে বসবাস বা ইউরোপে নাগরিকত্ব লাভ করার সুযোগ এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে একটি প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের মধ্যে বর্তমানে এই আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ হতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো একটি দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া মানেই ২৭টি সদস্য দেশে অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা এবং বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা।
অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চায় এই স্বপ্ন পূরণের জন্য সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত পথ কোনটি? কোন ইউরোপের কোন দেশে দ্রুত নাগরিকত্ব পাওয়া যায় বা দ্রুত সেটেলে হওয়া যায়।
সহজে ইউরোপে নাগরিকত্ব দেয়া দেশ

যারা ইউরোপ আসতে চাচ্ছেন বা ভাবছেন ইউরোপে যদি সেটেল হওয়া যায়। তাদের মাথায় একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে— তারা জানতে চাচ্ছেন করছেন, খুব অল্প সময়ে সহজ প্রক্রিয়ায় ইউরোপের কোন দেশে সেটেল হওয়া যায় বা নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। তাদের জন্যই আমার আজকের এই এপিসোড।
ইউরোপের নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ দেশগুলোকে একটি সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে এর মধ্যে থাকবে পর্তুগাল, সুইডেন, মালটা, ফ্রান্স, নরওয়ে এবং নেদারল্যান্ডস— এই ৬টি দেশ। কারন এই দেশগুলোতে অভিবাসীদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব বা স্থায়ী সেটেলমেন্টের সুযোগ দেয়।
যারা গ্রিনকার্ড নিয়ে আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার ইবি-৩ ভিসা চেষ্টা করতে পারেন। এটি সহজ ও নিরাপদ একটি পদ্ধতি। তবে, কিছুটা ব্যয় বহুল।
ইউরোপের কোন দেশে সেটেল হওয়া সবচেয়ে সহজ?
যদি প্রশ্নটি এমন হয়, ইউরোপের কোন দেশে সবচেয়ে সহজ বা ইউরোপে নাগরিকত্ব কোন দেশে দ্রুত পাওয়া যায়? , তাহলে আমি এক বাক্যে বলব— পর্তুগাল। কারণ পর্তুগাল এমন একটি দেশ যেখানে আপনি যদি বৈধভাবে আসেন একবার, এমনকি অবৈধভাবেও আসেন, তাহলেও এই দেশটিতে পরবর্তীতে আপনার সেটেল হওয়া বা নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইউরোপে স্থায়ীভাবে সেটেল হওয়া বা নাগরিকত্ব লাভের ক্ষেত্রে পর্তুগালকে সবচেয়ে সহজ দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। পর্তুগাল এমন একটি দেশ যেখানে আপনি বৈধ বা কখনও কখনও অবৈধভাবে প্রবেশ করলেও পরবর্তীতে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি হয়।
বৈধ পথে আপনি যদি আসেন, তাহলে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই আপনি প্রথমে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাবেন। এরপর আপনি স্থায়ীভাবে পাবেন, এবং সর্বোচ্চ নাগরিকত্ব পেতে সময় লাগবে পাঁচ বছর।
এই দেশে সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে— অন্য দেশের মতো কোনো রেস্ট্রিকশন নাই যে আপনাকে এ দেশেই থাকতে হবে। এই দেশ থেকে ইউরোপে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর আপনি বছরে মাত্র দুই সপ্তাহ যদি এই দেশটিতে থাকেন, তাতেই হবে, তাতেই আপনার নাগরিকত্ব টিকে থাকবে।
বৈধ পথে আগতদের জন্য মাত্র তিন মাসের মধ্যে অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নাগরিকত্ব লাভের পর অন্য অনেক দেশের মতো এখানে কড়া বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই; বছরে মাত্র দুই সপ্তাহ দেশটিতে অবস্থান করলেই নাগরিকত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।
দ্রুত নাগরিকত্ব প্রদানকারী ৬টি ইউরোপীয় দেশের প্রক্রিয়া ও শর্তাবলী
দ্রুততম সময়ে ইউরোপের নাগরিকত্ব লাভের জন্য ছয়টি দেশের প্রক্রিয়া, সময়সীমা এবং গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো এখানে তুলে ধরা হলো:
১. পর্তুগাল (Portugal)

| ক্যাটাগরি | প্রয়োজনীয় সময়সীমা (নাগরিকত্ব) | মূল শর্ত |
| সাধারণ বৈধ অভিবাসন | ৫ বছর | বৈধভাবে দেশটিতে প্রবেশ ও বসবাস (প্রথমেই ৩ মাসের অস্থায়ী রেসিডেন্সি) |
| নাগরিকত্ব বজায় রাখতে | বার্ষিক মাত্র ২ সপ্তাহ পর্তুগালে অবস্থান | নাগরিকত্ব লাভের পর দেশে থাকার জন্য কড়া কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। |
পর্তুগালে একবার বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারলে, তা কর্মসংস্থান বা অন্য কোনো বৈধ প্রক্রিয়াই হোক, নাগরিকত্বের পথ খুলে যায়। পাঁচ বছর পর আপনি সহজেই আবেদন করতে পারবেন। এই নমনীয়তা পর্তুগালকে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় অভিবাসীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
২. মালটা (Malta)

ইউরোপে নাগরিকত্ব পাওয়ার সহজ ও দ্রুত দেশ মালটাতে নাগরিকত্ব লাভ করার সবচেয়ে দ্রুত ও সহজ পদ্ধতি হলো বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব (Citizenship by Investment) বা স্থায়ী বাসস্থান (Residency by Investment) প্রোগ্রাম।
প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ: দেশটিতে স্থায়ীভাবে সেটেল হওয়ার জন্য আপনার ৭ লাখ ইউরো পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।
সময়সীমা: এই প্রক্রিয়ার জন্য সর্বোচ্চ ১২ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে।
সুবিধা: এই প্রক্রিয়ায় খুব সহজে ও অপেক্ষাকৃত কম সময়ে আপনি মালটার নাগরিকত্ব লাভ করতে পারবেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার পাবেন।
৩. সুইডেন (Sweden)
যারা ইউরোপে নাগরিকত্ব প্রত্যাশি তাদের জন্য সুইডেন (Sweden) একটি ভালো গন্তব্য হতে পারে। অভিবাসীদের জন্য সুইডেন একটি অত্যন্ত উদার দেশ। বিভিন্ন বৈধ প্রক্রিয়ায় (যেমন: স্টুডেন্ট ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট) সুইডেনে প্রবেশ করা সম্ভব এবং ইউরোপে নাগরিকত্ব নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।
সাধারণ পথ: বৈধভাবে ৫ বছর সুইডেনে বসবাস করলেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
ভাষার শর্ত: উল্লেখযোগ্যভাবে, সুইডেন এখনও পর্যন্ত কোনো বাধ্যতামূলক ভাষা শেখার বা পরীক্ষায় পাসের রেস্ট্রিকশন আরোপ করেনি।
দ্রুততম পথ (বিয়ে): যারা আরও অল্প সময়ে নাগরিকত্ব পেতে চান, তারা যদি কোনো সুইডিশ নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে মাত্র ২ বছর সেখানে বসবাস করেই সেটেল হতে পারেন। এক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পেতে সর্বোচ্চ ৩৯ মাস সময় লাগতে পারে।
৪. ফ্রান্স (France)
ফ্রান্স অনেক মানুষের জন্য পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম বা অন্যান্য ইস্যুতে থাকার একটি কেন্দ্র। এখানে সেটেল হওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ এবং অনেকেই এইভাবে এই দেশে ইউরোপে নাগরিকত্ব নিচ্ছে:
সাধারণ পথ: ফ্রান্সে টানা ৫ বছর বসবাস করলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ পন্থা: যদি কোনো স্টুডেন্ট ফরাসি ভাষায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করে, তবে তারা মাত্র ২ বছর পরেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে।
প্রয়োজনীয়তা: নাগরিকত্ব পেতে ফরাসি ভাষা জ্ঞান, তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে জানাশোনা প্রমাণ করতে হয়।
৫. নরওয়ে (Norway)
২০১৫ সালের পর থেকে নরওয়ে অভিবাসন নীতিতে অনেক বেশি উদার হয়েছে এবং দেশটি দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি চালু করেছে। এই সুযোগটি এখন বাংলাদেশিরাও নিতে পারেন। কিছু শর্তে নরওয়ে থেকে এই দেশ থেকে ইউরোপের নাগরিকত্ব পাওয়া যায়।
প্রয়োজনীয় সময়সীমা: ওয়ার্ক পারমিট বা স্টুডেন্ট হিসেবে বৈধভাবে ওয়ার্ক পারমিট এক্সটেন্ড করে টানা ৭ বছর নরওয়েতে বসবাস করলে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়।
গুরুত্বপূর্ণ শর্ত: নাগরিকত্ব পেতে পুলিশের ক্লিয়ারেন্স অত্যন্ত জরুরি। আপনি কোনো খারাপ কাজ করেননি এবং দেশের নিয়ম-কানুন মেনেছেন—এই মর্মে নরওয়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিলে ৭ বছর পর নাগরিকত্ব লাভে সমস্যা হবে না।
৬. নেদারল্যান্ডস (Netherlands)
নেদারল্যান্ডস কর্মমুখর একটি প্রাণবন্ত দেশ। এখানে ওয়ার্ক পারমিট বা স্টুডেন্ট হিসেবে যাওয়া যায়, তবে এখান থেকে ইউরোপে নাগরিকত্ব পাওয়া শর্ত কিছুটা কঠিন।
- ন্যূনতম বসবাস: নাগরিকত্বের আবেদন বিবেচনা করার জন্য অবশ্যই টানা ৫ বছর সেখানে বসবাস করতে হবে।
- দ্বৈত নাগরিকত্ব: নেদারল্যান্ডসে দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদিত নয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বজায় রাখতে চাইলে নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হবে।
- নাগরিকত্ব পরীক্ষা: নাগরিকত্ব লাভের জন্য একটি পরীক্ষা দিতে হয়, যেখানে দেশের জাতীয়তা ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রশ্ন থাকে এবং এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক।
৭. যুক্তরাজ্য (United Kingdom)
ইউনাইটেড কিংডম বা লন্ডন অনেকেরই স্বপ্নের গন্তব্য হলেও, এখানে স্থায়ী সেটেলমেন্টের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ এবং শর্তসাপেক্ষ।
- অফিসিয়াল সময়সীমা: অফিসিয়ালি বলা হয়, ৫ বছর সেখানে বসবাস করলে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য আবেদন করা যেতে পারে।
- বাস্তব পরিস্থিতি: বর্তমানে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের জন্য আনঅফিসিয়ালি অন্তত ১০ বছর না থাকলে আবেদন করা কঠিন হতে পারে।
- বাধ্যতামূলক পরীক্ষা: যুক্তরাজ্যে স্থায়ী সেটেলমেন্ট বা নাগরিকত্ব পেতে হলে “লাইফ ইন দ্য ইউকে” নামে একটি পরীক্ষায় অবশ্যই পাস করতে হয়। এই পরীক্ষায় পাস না করলে বসবাসের সময়কাল যাই হোক না কেন, নাগরিকত্ব বা সেটেলমেন্টের আবেদন মঞ্জুর হয় না।
FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী)
ইউরোপের কোন দেশে সবচেয়ে কম সময়ে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়?
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে পর্তুগাল সর্বনিম্ন ৫ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়, যা সাধারণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে দ্রুততম। সুইডিশ নাগরিককে বিয়ে করলে সুইডেনে ২ বছর পরেই আবেদন করা যেতে পারে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের জন্য নাগরিকত্ব লাভের সহজতম উপায় কী?
ফ্রান্সে কোনো স্টুডেন্ট ফরাসি ভাষায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পড়াশোনা সম্পন্ন করলে, তারা মাত্র ২ বছর পরেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে, যা সাধারণ ৫ বছরের নিয়মের চেয়ে অনেক দ্রুত।
মালটাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেতে কেমন খরচ হতে পারে?
মালটাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সহজে নাগরিকত্ব লাভ করার জন্য প্রায় ৭ লাখ ইউরো পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হতে পারে। এই প্রক্রিয়াটি ১২ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
পর্তুগালের নাগরিকত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বছরে কতদিন দেশটিতে থাকতে হয়?
পর্তুগালে নাগরিকত্ব লাভ করার পর এটি টিকিয়ে রাখার জন্য বছরে মাত্র ২ সপ্তাহ দেশটিতে অবস্থান করলেই যথেষ্ট, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের কড়া রেস্ট্রিকশনের তুলনায় অনেক নমনীয়।
নরওয়েতে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা কী বাংলাদেশিরা নিতে পারে?
হ্যাঁ, ২০১৫ সালের পর থেকে নরওয়ে দ্বৈত নাগরিকত্বের নীতি চালু করেছে, যার ফলে বাংলাদেশিরা তাদের পূর্বের নাগরিকত্ব বজায় রেখেই নরওয়ের নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ নিতে পারে।


4 Comments
Pingback: জার্মানি অপরচুনিটি কার্ড ভিসা: সম্পূর্ণ A to Z গাইড - Ultimate A to Z Guide for Germany Opportunity Card Visa - NiceTrix
ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন এবার সত্যি হতে পারে।
Pingback: বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া ভিসা নিয়ে ইউরোপ প্রবেশের পূর্ণাঙ্গ গাইড লাইন - Complete Croatia Visa Guide for Legal Entry & Success
Pingback: দালাল ছাড়া আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আবেদন করার নিয়ম - Apply for Ireland Work Permit in Just 7 Simple Steps (No Agent Needed) - NiceTrix