আপনারা যারা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষ বা যোগ্য এবং কোনো দালালের সাহায্য বা অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই ইউরোপের একটি উন্নত দেশে দালাল ছাড়া আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা (Ireland Work Permit) নিয়ে নিজের যোগ্যতায় কাজ করে স্থায়ী হতে চান, তাদের জন্য এই আলোচনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ জানাবো যুক্তরাজ্যের ঠিক পাশের দেশ আয়ারল্যান্ড নিয়ে। এই দেশটিতে আপনি কীভাবে কোনো প্রকার দালালির সহযোগিতা ছাড়া সম্পূর্ণ নিজে নিজে ওয়ার্ক পারমিট বের করতে পারবেন এবং সেই ভিসা নিয়ে দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন, তার প্রতিটি ধাপ জানাবো।
আমার এই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে আপনি সহজেই আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া আগে আপনি জেনে নিতে পারেন ইউরোপে নাগরিকত্ব যে ৬টি দেশে দ্রুত ও সহজে লাভ করা যায়।
আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকেই প্রায়শই প্রশ্ন করেন, “দালাল ছাড়া কীভাবে কোনো দেশে যাওয়া যায়?” তাদের জন্যই আমার আজকের এই কনটেন্ট। আয়ারল্যান্ড সরকার প্রবাসী কর্মীদের জন্য বেশ কিছু ওয়ার্ক পারমিটের সুযোগ রেখেছে, যার মাধ্যমে আপনি বৈধভাবে সেখানে কাজ করতে ও বসবাস করতে পারেন।

সঠিক তথ্য জানা থাকলে আয়ারল্যান্ড সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ এন্টারপ্রাইজ, ট্রেড অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আপনি নিজেই সম্পন্ন করতে পারবেন।
ওয়ার্ক পারমিটের প্রকারভেদ
আয়ারল্যান্ডে মূলত নয় ধরনের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। তবে এর মধ্যে দুটি পারমিট আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। অযথা অন্যগুলো নিয়ে এই মুহুর্তে চিন্তার প্রয়োজন নেই।
কারন সেই দেশে ৯ ধরনের ওয়ার্ক পারমিট থাকলেও মূলত ২ ধরনের ওয়ার্ক পারমিটের অধীনে আপনি পড়বেন — একটি হলো জেনারেল ওয়ার্ক পারমিট এবং আরেকটি হলো ক্রিটিক্যাল স্কিলস ওয়ার্ক পারমিট। সাধারণত আমরা জেনারেল ওয়ার্ক পারমিটেই আবেদন করি, কারণ এতে বেশিরভাগ চাকরির ধরন অন্তর্ভুক্ত থাকে।
আপনি দেখতে পারেন- বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার ইবি-৩ ভিসা: গ্রিন কার্ড পাওয়ার সম্পূর্ণ গাইড
জেনারেল ওয়ার্ক পারমিট (General Work Permit)
এটি সবচেয়ে সাধারণ ক্যাটাগরি, কারণ এর অধীনে প্রায় সব ধরনের চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। বেশিরভাগ আবেদনকারী সাধারণত এই পারমিটের জন্যই যোগ্য হন।
আপনি ওয়েবসাইটে ‘General Work Permit’ অপশনে ক্লিক করে এর বিস্তারিত দেখতে পারেন। সেখানে একটি সরকারি ভিডিওসহ আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে সকল তথ্য দেওয়া আছে।
ক্রিটিক্যাল স্কিলস ওয়ার্ক পারমিট (Critical Skills Work Permit)
বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন পেশাদারদের জন্য এই পারমিটটি প্রযোজ্য। আপনার পেশা যদি আয়ারল্যান্ডের চাহিদার তালিকায় থাকে, তবে আপনি এর জন্য আবেদন করতে পারবেন।
কিভাবে আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করবেন?
আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক এবং বেশ সহজ। আপনাকে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে।
ধাপ ১: অনলাইন পোর্টালে প্রবেশ করুন
আয়ারল্যান্ড সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ এন্টারপ্রাইজ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে “Employment Permits Online System” (EPOS) অংশে যান। মূলত এখানেই আপনাকে আবেদনপত্র জমা দিতে হবে।

ধাপ ২: আবেদন শুরু করুন
EPOS সিস্টেমে লগইন করে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- প্রথমে “Apply for a new Employment Permit” অপশনটি নির্বাচন করুন।
- এরপর “I am an employee applying for a work permit” অপশনটি বেছে নিন, কারণ আপনি নিজের জন্য আবেদন করছেন।

- প্রয়োজনীয় তথ্য, যেমন—পাসপোর্ট নম্বর, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, নাম এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বিবরণী পূরণ করুন।
- ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করার পর আবেদন ফি পরিশোধ করে সাবমিট করুন।
আপনি জার্মানি অপরচুনিটি কার্ড ভিসা সম্পর্কে জানেন? বাংলাদেশীদের মধ্যে এখন এটি খুবই জনপ্রিয় একটি প্রসেস।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস চেক করুন
আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আবেদনের আগে আপনার কী কী ডকুমেন্ট প্রয়োজন হবে, তা জেনে নেওয়া জরুরি। এর জন্য ওয়েবসাইটের চেকলিস্ট (Checklist) সেকশনে যান এবং আপনার পারমিট টাইপ (যেমন: জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিট) অনুযায়ী ডকুমেন্টের তালিকাটি দেখুন।
জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিট চেকলিস্টে যা যা প্রয়োজন:
- নিয়োগকর্তার বিবরণ (Employer Details): কোম্পানির তথ্য।
- চাকরির বিবরণ (Job Description): আপনার পদ ও দায়িত্ব।
- বেতনের তথ্য (Salary Information): আপনার মাসিক বা বাৎসরিক বেতন।
- আবেদনকারীর বিবরণ (Applicant’s Details): আপনার ব্যক্তিগত তথ্য।
- ফি সম্পর্কিত তথ্য (Fee Information): আবেদন ফি পেমেন্টের প্রমাণ।
আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে ওয়েবসাইটে দেওয়া ইমেইল বা ফোন নম্বরের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। সাধারণত তারা ইমেইলের মাধ্যমে দ্রুত উত্তর দিয়ে থাকে।
আবেদন ফি এবং প্রসেসিং টাইম
ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে একটি নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হয়, যা পারমিটের মেয়াদের ওপর নির্ভর করে।
- আবেদন ফি: জেনারেল বা ক্রিটিক্যাল স্কিলস—উভয় পারমিটের ক্ষেত্রেই দুই বছরের জন্য ফি হলো ১০০০ ইউরো।
- রিফান্ড পলিসি: যদি আপনার আবেদনটি কোনো কারণে সফল না হয়, তবে পরিশোধ করা টাকার ৯০ শতাংশ আপনাকে ফেরত দেওয়া হবে। এই টাকা সাধারণত ৮ সপ্তাহের মধ্যে রিফান্ড করা হয়।
- প্রসেসিং টাইম: আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত এক মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়।
চাকরি খুঁজে পাবেন কোথায়?
ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করার আগে আপনার একটি চাকরির অফার প্রয়োজন। আইরিশ কোম্পানিগুলো তাদের চাকরির বিজ্ঞপ্তিগুলো একটি নির্দিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে।
- জব পোর্টাল: চাকরি খুঁজে পেতে আপনাকে jobsireland.ie ওয়েবসাইটে যেতে হবে।
- নিয়োগ প্রক্রিয়া: আইরিশ আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়ার আগে বিজ্ঞপ্তিটি এই পোর্টালে কমপক্ষে ২৮ দিন রাখতে হয়। যদি এই সময়ের মধ্যে তারা স্থানীয় কোনো যোগ্য প্রার্থী না পায়, তবেই তারা বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ দিতে পারে।
আপনাকে নিয়মিত এই সাইটটিতে নজর রাখতে হবে এবং আপনার যোগ্যতার সাথে মিলে যায় এমন চাকরিতে আবেদন করতে হবে। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতেই কোম্পানির বিস্তারিত তথ্য এবং যোগাযোগের উপায় উল্লেখ করা থাকে।
ইউরোপ যাওয়াই যদি একমাত্র স্বপ্ন হয় তাহলে বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া ভিসা নিয়ে ইউরোপ প্রবেশের পূর্ণাঙ্গ গাইড লাইন পড়ে নিন।
নিয়োগকর্তার ভূমিকা
আপনি যখন কোনো কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাবেন, তখন সেই কোম্পানি আপনাকে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। অনেক ক্ষেত্রে, আপনার নিয়োগকর্তাই আপনার হয়ে আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে দেয়, যা আপনার জন্য কাজটি আরও সহজ করে তোলে।
আশা করি, আমি আপনাদের সামনে আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নেওয়ার পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে পেরেছি। আবেদন করার সময় অবশ্যই নিজের নামে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করবেন। যদি কোনো প্রশ্ন বা সমস্যা হয়, তবে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
৩. প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) Section
১. আয়ারল্যান্ডে কাজের জন্য সবচেয়ে সাধারণ ওয়ার্ক পারমিট কোনটি?
আয়ারল্যান্ডে কাজের জন্য সবচেয়ে সাধারণ ওয়ার্ক পারমিট হলো “জেনারেল এমপ্লয়মেন্ট পারমিট”। কারণ এর অধীনে বেশিরভাগ চাকরির ধরন অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং এটি একটি শ্রেণীর কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত।
২. আয়ারল্যান্ড ওয়ার্ক পারমিট ভিসা আবেদন বাতিল হলে কি টাকা ফেরত পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, যদি আপনার ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন গৃহীত না হয়, তবে আবেদন ফি-এর ৯০ শতাংশ আপনাকে ফেরত দেওয়া হবে। এই রিফান্ড প্রক্রিয়াটি সাধারণত আট সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
৩. আয়ারল্যান্ডে চাকরি খোঁজার জন্য সেরা ওয়েবসাইট কোনটি?
আয়ারল্যান্ডে চাকরি খোঁজার জন্য সেরা সরকারি ওয়েবসাইট হলো jobsireland.ie। আইরিশ কোম্পানিগুলো তাদের চাকরির শূন্যপদের বিজ্ঞপ্তি এখানেই প্রকাশ করে থাকে।
৪. ওয়ার্ক পারমিট পেতে সাধারণত কত সময় লাগে?
ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন প্রক্রিয়া সাধারণত এক মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। তবে এটি বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।
৫. আমি কি নিজের জন্য সরাসরি ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করতে পারি?
হ্যাঁ, আপনি সরাসরি “Employment Permits Online System” (EPOS) ব্যবহার করে নিজের জন্য ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করার সময় আপনাকে “I am an employee applying for a work permit” অপশনটি বেছে নিতে হবে।

