ক্রোয়েশিয়া দেশটি সম্প্রতি শেনজেনভুক্ত দেশ হয়েছে। অনেক আগে থেকেই ইউরোপের দেশ ছিল, কিন্তু শেনজেনভুক্ত দেশ হওয়ার পর আপনাদের অনেকের আগ্রহের জায়গা এখন এই ক্রোয়েশিয়া। কারণ ক্রোয়েশিয়া নতুন শেনজেন ভুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশীরা যারা ইউরোপে আসতে চাচ্ছেন, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বা বাংলাদেশ থেকে তাদের জন্য অনেকটা সহজ হয়ে গেছে ইউরোপে প্রবেশের দ্বার।
এই আর্টিকেল রচনা করার সময় আমি সরেজমিনে ক্রোয়েশিয়া কয়েকদিন অবস্থান করেছিলাম এবং আমার প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক, অর্থাৎ ভালো এবং খারাপ উভয় দিকগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করবো। তাই সহজেই আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া ভিসা
আজকের আয়োজনে থাকবে বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার পূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে— কত টাকা খরচ হবে, কি করতে হবে, সব কিছু। এছাড়াও এই দেশে অবস্থান করছেন বাংলাদেশীরা ইতিমধ্যে আছেন তারা কি কাজ করেন, তাদের সাথে কথা বলব এবং তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেব— যারা নতুন আসবেন তারা কোন বিষয়ে সতর্ক থাকবেন, কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন এবং তারা কি কি পরামর্শ দিচ্ছেন।

এই প্রতিবেদনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া যাওয়া সম্পর্কে যার মনে প্রশ্ন আছে, সব উত্তর পাবেন। এই বিষয়ে অন্যকে সাহায্য করতে চান তাহলে শেয়ার করবেন। তো চলুন কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক ক্রোয়েশিয়ায় আপনি কেন আসবেন আর কেন আসবেন না।
আপনাদের মধ্যে যারা গ্রিন কার্ড নিয়ে কাজের ভিসায় আমেরিকা যেতে চান তারা চাইলে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার ইবি-৩ ভিসা সহজেই সেখানে সেটেল হতে পারেন।
ক্রোয়েশিয়া সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
এই দেশটা দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের খুব সুন্দর একটি দেশ, জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক, অনেক কম। যেখানে বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষ, সেখানে এই দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ৪০ লাখ (২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী)। এখন হয়তো বেড়ে ৫০ বা ৬০ লাখ হবে।
ক্রোয়েশিয়া একটি ছোট দেশ, জনসংখ্যা কম। বাংলাদেশে যেখানে আয়তন ১,৪৭,০০০ বর্গকিলোমিটার, সেখানে ক্রোয়েশিয়ার আয়তন মাত্র ৫৬,০০০ বর্গকিলোমিটার। সুতরাং তুলনা করলে সহজেই কল্পনা করতে পারবেন দেশটা কেমন। আমি শুরুতে পজিটিভ দিকগুলো বলছি, এরপর বলব নেগেটিভ দিকগুলো।
ক্রোয়েশিয়া আসার ইতিবাচক দিকসমূহ (Pros of Coming to Croatia)
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার প্রধান ইতিবাচক দিকগুলো নিম্নরূপ, যা বিশেষত নতুন শেনজেনভুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশীদের জন্য ইউরোপে প্রবেশকে সহজ করেছে:
শান্তিপ্রিয় পরিবেশ ও সহজ আগমন পথ: এই দেশটি খুবই শান্তিপ্রিয়। আপনি যদি এখন এই দেশটিতে আসতে চান, তাহলে এখনকার পথ অনেকটাই সহজ।
কাজের সুযোগ (ওয়ার্ক পারমিট): বর্তমানে ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে দুইটি ক্ষেত্রে এই দেশে কাজ করতে আসা যায়— বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন সেক্টরে এবং রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন খাতে।
কারণ এই দেশ এখন নতুন শেনজেনভুক্ত হওয়ার পর অনেক কিছু ডেভেলপ হচ্ছে। এই খাতগুলোতে বিশেষভাবে বাংলাদেশীরা কাজ করে থাকেন। রেস্টুরেন্ট, পর্যটন ও কনস্ট্রাকশন—এই খাতগুলোতে খুব সহজেই কাজের সুযোগ পাওয়া যায়।
ভাষার সুবিধা (বেসিক ইংরেজি): ইউরোপে অনেক বড় সমস্যা হলো ভাষা, কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার একটি সুবিধা হচ্ছে আপনি যদি বেসিক ইংরেজি জানেন তাহলে চলতে পারবেন।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি— ইউরোপের অনেক দেশে গিয়েছি, সেখানে মানুষ ইংরেজিতে কথা বলতে চায় না, কিন্তু ক্রোয়েশিয়ায় দেখেছি ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে রেস্টুরেন্ট কর্মচারী পর্যন্ত অনেকেই বেসিক ইংরেজি জানে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। তাই বেসিক ইংরেজি জানলে এখানে চলা সম্ভব, যা ইউরোপের অন্য দেশে প্রায় অসম্ভব।
কম খরচ: যেহেতু ক্রোয়েশিয়া নতুন শেনজেনভুক্ত দেশ, তাই অন্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় এখানে আসার খরচ কিছুটা কম। ফলে যারা কম খরচে ইউরোপে ঢুকতে চান, তাদের জন্য এই দেশটি একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ ও সহজে রেসিডেন্স কার্ড: এখানকার লোকজনও খুবই ফ্রেন্ডলি। কাজ শেখাতে সাহায্য করে, আন্তরিকভাবে সহায়তা করে। আপনি যদি লিগাল ভিসা নিয়ে আসেন, তাহলে দুই মাসের মধ্যেই টেম্পোরারি রেসিডেন্স কার্ড পেয়ে যাবেন, যা একটি বড় সুবিধা।
তুলনামূলক কম জীবনযাত্রার খরচ: এখানকার খরচও তুলনামূলক কম—বাসা ভাড়া, খাবার-দাবার সবই অন্য দেশের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী।
এছাড়াও ইউরোপে নাগরিকত্ব যে ৬টি দেশে দ্রুত ও সহজে লাভ করা যায় তাদের মধ্যে ক্রোয়েশিয়া অন্যতম। তাই সুযোগ পেলে দ্রুত কাজে লাগানো উচিত।
ক্রোয়েশিয়া আসার নেতিবাচক দিকসমূহ (Cons of Coming to Croatia)
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ও নেতিবাচক দিকও বিবেচনা করা প্রয়োজন:
বেতন ও আয়ের সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশীরা এখানে এসে দীর্ঘদিন থাকতে চায় না। তারা মনে করে অন্য উন্নত ইউরোপীয় দেশে গেলে বেশি আয় করা সম্ভব। তবে বাস্তবে ক্রোয়েশিয়ায় শুরুতে মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ ইউরো, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া যায়। এর বেশি আয় শুরুতে কঠিন।
ব্যবসা শুরু করার জটিলতা: ইউরোপের অনেক দেশে সহজে ব্যবসা শুরু করা যায়, কিন্তু ক্রোয়েশিয়ায় এখনো তেমনটা সহজ নয়। এখানকার নাগরিকদের সাথে যৌথভাবে বিনিয়োগ না করলে শুরুতেই ব্যবসা শুরু করা কঠিন। তাই যারা চাকরি না করে ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি সীমাবদ্ধতা।
আবহাওয়া ও শীত: ক্রোয়েশিয়ার আবহাওয়া ভালো হলেও শীতে বরফ পড়ে। যাদের ঠান্ডা সমস্যা আছে, তাদের জন্য এটি কষ্টকর হতে পারে।
ভাষাগত অসুবিধা: যারা ইংরেজি জানেন না, বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার পর তাদের জন্য কাজ খুঁজে পাওয়া বা কাজ ধরে রাখা কঠিন হবে।
সরকারি দুর্নীতি: এখানকার সরকার এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। স্থানীয়রা নিজেরাই বলেন যে সরকারি কিছু বিভাগে দুর্নীতি আছে, যেমন পুলিশ বিভাগে। ফলে কিছু অফিসিয়াল কাজ করতে জটিলতা হতে পারে।
এশিয়ান খাবারের দুষ্প্রাপ্যতা: বাংলাদেশিদের পছন্দের খাবার বা পণ্য এখানকার বাজারে খুব কম পাওয়া যায়। যেমন চিকন চাল, মসলা বা দক্ষিণ এশিয়ার খাবার—এসব পাওয়া কঠিন ও দামি। তাই এখানকার খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়াই ভালো।
দালালদের সক্রিয়তা ও উচ্চ খরচ: নতুন শেনজেন দেশ হওয়ার পর দালালদের সক্রিয়তা বেড়েছে। তারা অনেক বেশি টাকা দাবি করে। অনেকেই বলেছেন ১৩-১৪ লাখ টাকার নিচে সম্ভব নয়, কিন্তু আসলে এত খরচ লাগে না। সঠিক পরিচিত বা বিশ্বস্ত এজেন্সির মাধ্যমে করলে কম টাকায় ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া যায়।
সবকিছু মিলিয়ে ক্রোয়েশিয়ার ইতিবাচক দিক বেশি, তবে কিছু নেতিবাচক দিকও আছে। আপনি কি করতে চান, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেমন— তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অবশ্যই বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া লিগাল পথে আসার চেষ্টা করবেন, না হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং ভবিষ্যতে অন্যদের জন্য সমস্যা তৈরি হয়।

ক্রোয়েশিয়া আসার পূর্ণ প্রক্রিয়া ও আনুমানিক খরচ
এই পর্যায়ে আপনারা যারা বাংলাদেশ থেকে বা অন্য কোনো দেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসতে চান, তাদের ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা সর্বশেষ তথ্য জানা প্রয়োজন। আসার প্রক্রিয়াগুলো কী, কি কি ডকুমেন্টস লাগবে, কত সময় লাগতে পারে, এখানে এসে আপনি কি কাজ করবেন, কত টাকা ইনকাম করতে পারবেন, পুরো প্রসেসটি করতে কত টাকা খরচ হতে পারে এবং স্থায়ী হতে কতদিন লাগতে পারে— এসব বিষয়ে স্টেপ বাই স্টেপ আলোচনা করব।
এখান থেকে আপনি বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া যাওয়ার প্রসেস ওভারঅল একটি ধারণা পাবেন যে কিভাবে এই দেশটিতে আসবেন, কিভাবে এগোবেন, কত খরচ হবে এবং আদৌ আসা উচিত কিনা তা নির্ধারণ করতে পারবেন। আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি, আমি লাকিনাজমিন সোমা, এই মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব থেকে।
ক্রোয়েশিয়া আসার ধাপসমূহ (Step-by-Step Process)
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার জন্য প্রধানত ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা করতে হয়। এটি এজেন্সি বা দালালের মাধ্যমে করা যেতে পারে, যদিও নিজে আবেদন করা জটিল।
Total Time: 60 days
ধাপ ১: ওয়ার্ক পারমিট সংগ্রহ
আপনাকে একটি ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট ব্যবস্থা করতে হবে। এই ওয়ার্ক পারমিট আপনি নিজে আবেদন করতে পারেন অথবা এজেন্সির মাধ্যমে। তবে নিজের মাধ্যমে আবেদন করা অনেক জটিল, এবং সফলতার সম্ভাবনা খুবই কম, প্রায় ১ শতাংশের মতো। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এজেন্সির মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট ম্যানেজ করা হয়।
ধাপ ২: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস প্রস্তুতি
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে নিম্নলিখিত ডকুমেন্টসগুলো প্রয়োজন:
১. বৈধ বাংলাদেশের পাসপোর্ট।
২. বাংলাদেশের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
৩. একাডেমিক সার্টিফিকেটসমূহ (যেমন এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক)।
৪. পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
৫. কাজের অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট (যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন)।
একাডেমিক সনদগুলো বাংলাদেশ সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে সার্টিফিকেট সত্যায়ন করে নিতে হবে।
ধাপ ৩: ভিসা প্রসেসিং ও সময়কাল
যখন আপনার ওয়ার্ক পারমিট ম্যানেজ হবে, তখন ভিসার জন্য প্রসেসিং শুরু হবে। সাধারণত যে এজেন্সি আপনার ওয়ার্ক পারমিট ম্যানেজ করে, তারাই আপনাকে ভিসার ব্যবস্থা করে দেয়।
মোট সময়কাল: বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার নির্দিষ্ট সময় বলা কঠিন, তবে সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আপনার ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা উভয়ই সম্পন্ন হয়।
ধাপ ৪: ক্রোয়েশিয়ায় আগমন ও রেসিডেন্স পারমিট
আপনি ভিসা পেয়ে গেলেন এবং ফ্লাইটে করে ক্রোয়েশিয়ার জাগরেবে এলেন। এবার আপনার রেসিডেন্স পারমিট পাওয়ার পালা।
দায়িত্ব: আপনি যে কোম্পানির মাধ্যমে এসেছেন, সেই কোম্পানিই সাধারণত আপনার রেসিডেন্স পারমিটের প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে দেয়।
সুবিধা: এখানে বাড়িভাড়া, ওয়ার্ক পারমিট এবং রেসিডেন্স কার্ডের কাজগুলো কোম্পানি অনেকটা নিজের দায়িত্বে করে থাকে।
কার্ড প্রাপ্তি: সাধারণত ১ থেকে ১.৫ মাসের মধ্যে আপনি টেম্পোরারি রেসিডেন্স কার্ড পেয়ে যান, যা আপনাকে ক্রোয়েশিয়ায় বৈধভাবে বসবাসের অনুমতি দেয়।
ক্রোয়েশিয়া আসার আনুমানিক খরচ (Estimated Cost)
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার পুরো প্রক্রিয়ায় কত টাকা খরচ হতে পারে, তার একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
| প্রক্রিয়া | আনুমানিক খরচ (বাংলাদেশী টাকায়) | মন্তব্য |
| এজেন্সি চার্জ ও মোট খরচ | ৮ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা | শেনজেন দেশ হওয়ায় চাহিদা বেশি, তাই এজেন্সিগুলো এই রেঞ্জের মধ্যে চার্জ করে। বিরল ক্ষেত্রে ৮-৯ লাখ টাকাও হতে পারে। |
| অবৈধ ইউরোপিয়ানদের খরচ | অনেক কম | যারা ইউরোপের অন্য কোনো দেশ থেকে (বৈধভাবে) আসতে চান, তাদের এত খরচ লাগবে না। এজেন্সি ছাড়াই কাজ ও রেসিডেন্স কার্ড নিজে করা সম্ভব। |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- শেনজেন সুবিধা: এই খরচ করে ক্রোয়েশিয়া এলে আপনি বৈধভাবে অন্য ২৬টি শেনজেন দেশে যাতায়াত করতে পারবেন।
- আয়ের প্রত্যাশা: বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া এসে শুরুতে মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ ইউরো (প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা) বেতন আশা করা যায়।
ক্রোয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশীদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া এসে বর্তমানে প্রায় দশ হাজার মত বাংলাদেশি বসবাস করছেন (এটা কোনো অফিসিয়াল হিসাব নয়)। তারা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন। আমি তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি যারা বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট বা কনস্ট্রাকশন সেক্টরে কাজ করছেন।
তাদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি এই দেশে তাদের অভিজ্ঞতা কেমন। যারা ভবিষ্যতে আসতে চান, তাদের ক্ষেত্রে তারা কী বলছেন, কী কী পরামর্শ দিচ্ছেন — সেই ব্যাপারগুলো আপনি যদি সরাসরি তাদের মুখ থেকে জেনে এখানে তুলে ধরলাম। তাহলে অনেকটাই আপনার জন্য উপকার হবে এবং আপনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে পারবেন।
ক্রোয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা
একজন প্রবাসী বাংলাদেশী ভাই তার বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন:
বসবাসের সময়কাল: এই তো আমার এখানে হলো আট মাস।
সুবিধাসমূহ: এখানে আলহামদুলিল্লাহ, আমার সবকিছুই ভালো। কাজ শেখার দিক থেকে, বাসাটার উপরে ওরা বেশি মনোযোগ দেয়। ওরা মূলত খুব হেল্পফুল, যেকোনো কাজে সাহায্য করে, বিশেষ করে কাজ শেখার ক্ষেত্রে।
কাজের পরিবর্তন: আমি প্রথমে কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করতাম। সম্প্রতি, চার-পাঁচ দিন হলো আমি অন্য একটি কোম্পানিতে যোগ দিয়েছি। সেটা হলো একটি ফুড ফ্যাক্টরি, যেখানে পিজা, বার্গারসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি হয়। সেখানে আমি প্যাকেটিংয়ের কাজ করি।
অন্য দেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা: অনেকে বলেন, ক্রোয়েশিয়াতে আসার পর অনেকেই অন্য দেশে চলে যান। কেন মানুষ থাকতে চান না, সেটা আমি জানি না। তবে আমি বলব, এখানে থেকে কাজ শেখা, অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং ধীরে ধীরে স্থিত হওয়াই ভালো।
থাকা-খাওয়ার সুবিধা: বেশিরভাগ কোম্পানি এখানকার কর্মীদের থাকা-খাওয়ার খরচ দিয়ে দেয়, যা অন্য দেশে সাধারণত নিজের বহন করতে হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত বেতন প্রায় সমান হয়ে যায়। তাই নতুন যারা আসবে, তারা এখানেই থাকলে ভালো।
বেতন কাঠামো ও উন্নতি: প্রথমে নতুন আসা কর্মীরা হয়তো ৬০০ থেকে ৮০০ ইউরোর মতো বেতন পান। কিন্তু ভাষা শেখার পর এবং কাজ ভালোভাবে বোঝার পর বেতন বাড়ে। ধীরে ধীরে উন্নতি হয়, তাই ধৈর্য ধরে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা: যদি ভবিষ্যতে আরও ভালো অফার পাই, তাহলে লিগ্যালভাবে অন্য দেশে যাব, অবৈধভাবে নয়। আমার স্বপ্ন নিজের ব্যবসা করা, যখন আমি এখানে পার্মানেন্ট হবো।
আগতদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ক্রোয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশীরা নতুনদের জন্য বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো প্রদান করেছেন:
আসার যৌক্তিকতা: আসা উচিত কারণ সবারই একটা স্বপ্ন থাকে যে ভালো একটা দেশে সেটআপ হবে। ইউরোপের এক দেশে ঢুকলেই হলো, এরপর অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগও থাকে। ক্রোয়েশিয়া এখন সেনজেনভুক্ত দেশ, তাই এখান থেকে অন্য দেশে যেতেও সুবিধা হবে।
ভাষা শিক্ষা: এখানে কাজের মূল জিনিসটা হলো ভাষা। ভাষা না বুঝলে কাজেও সমস্যা হয়। এখানকার লোকজন ইংরেজি খুব একটা বুঝে না।
খরচ বৃদ্ধি: বাংলাদেশ থেকে যারা আসছেন, তাদের জন্যও সুযোগ আছে। তবে খরচটা এখন অনেক বেড়েছে। আগে যেখানে কম খরচে আসা যেত, এখন শেনজেনভুক্ত হওয়ার কারণে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সবকিছু মিলে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লক্ষ টাকার মতো খরচ হয়।
ধৈর্য ও স্থিতিশীলতা: এখানে থেকে কাজ শেখা, অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং ধীরে ধীরে স্থিত হওয়াই ভালো।
আইনি পথ: ভবিষ্যতে অন্য দেশে যেতে হলে লিগ্যালভাবে যাওয়া উচিত, অবৈধভাবে নয়।
আশা করি, তাদের বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসার এবং সেখানে অবস্থান করার অভিজ্ঞতার কথাগুলো শুনে আপনাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। যারা এখানে কাজ করছেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে সত্য। এখন সিদ্ধান্ত আপনার — ক্রোয়েশিয়া আপনার জন্য উপযুক্ত কি না, সেটা আপনি নিজেই বিবেচনা করুন।
FAQ (সাধারণ জিজ্ঞাসা)
১. নতুন শেনজেন দেশ হিসেবে ক্রোয়েশিয়াতে বাংলাদেশীদের কাজ পাওয়ার প্রধান খাতগুলো কী কী?
নতুন শেনজেন দেশ হিসেবে, বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া এসে বাংলাদেশীরা প্রধানত কনস্ট্রাকশন সেক্টরে এবং রেস্টুরেন্ট ও পর্যটন খাতে সহজেই ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে কাজ খুঁজে পান।
২. ক্রোয়েশিয়ায় একজন নতুন কর্মী শুরুতে মাসে কত ইউরো বেতন আশা করতে পারেন?
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া এসে একজন নতুন কর্মী শুরুতে মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ ইউরোর মতো বেতন আশা করতে পারেন, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০-৯০ হাজার টাকা। ভাষা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়লে বেতন বৃদ্ধি পায়।
৩. ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আনুমানিক কত সময় লাগতে পারে?
ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট এবং ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে। এজেন্সির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৪. ক্রোয়েশিয়ায় এসে টেম্পোরারি রেসিডেন্স কার্ড পেতে বাংলাদেশী কর্মীদের কতদিন সময় লাগে?
বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া এসে, কোম্পানি কর্তৃক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর, সাধারণত ১ থেকে ১.৫ মাসের মধ্যে একজন বাংলাদেশী কর্মী টেম্পোরারি রেসিডেন্স কার্ড পেয়ে যান।
৫. ইউরোপের অন্য দেশ থেকে যারা বৈধভাবে ক্রোয়েশিয়া আসতে চান, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি কেমন?
ইউরোপের অন্য দেশ থেকে বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে ক্রোয়েশিয়া আসতে চাওয়া কর্মীদের জন্য প্রক্রিয়া অনেক সহজ এবং কম খরচ সাপেক্ষ। তারা এজেন্সি ছাড়াই সরাসরি কাজ খুঁজে ওয়ার্ক পারমিট এবং রেসিডেন্স কার্ডের আবেদন করতে পারেন।


1 Comment
Pingback: ক্রোয়েশিয়া ওয়ার্ক পারমিট ভিসা সর্বশেষ তথ্য - Croatia Work Permit Visa: 5 Essential Steps to Success - NiceTrix