দু হাজার বাইশ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে তিন হাজার নয়শো একাত্তর প্রজাতির সাপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, যার মধ্যে বিষধর প্রজাতি হচ্ছে ছয়শোটি। এদের মধ্যে আবার কিছু সাপ এতটাই মারাত্মক যে এদের একটিমাত্র ছোবল থেকে নির্গত বিষ বিশ থেকে একশো জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলতে সক্ষম। যেমন ইংল্যান্ড টাইপেন-এর একটি ছোবলে থাকা বিষ পাঁচ লক্ষ ইঁদুর কিংবা একশোর বেশি মানুষকে মেরে ফেলতে সক্ষম। প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রজাতির বিষাক্ত প্রাণী রয়েছে, তবে আমাদের দেশে বিষধর প্রাণীর মধ্যে সাপই প্রধান।
বাংলাদেশে প্রতি বছর সাত হাজার জন মানুষ এবং ভারতে আটান্নো হাজার জন মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়াতে সবচেয়ে বিষধর সাপ ইংল্যান্ড টাইপেন সহ আরো অনেক বিষধর সাপের আবাসভূমি হওয়ার পরেও, সেখানে সাপের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা খুবই নগণ্য, প্রতি বছর মাত্র দুইজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সাপের কামড়ে আফ্রিকা, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ মানুষ মারা যান, অর্থাৎ উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত দেশে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই সকল দেশের মানুষ, প্রথমত সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কুসংস্কার লালন করেন, দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য নয়, তৃতীয়ত অ্যান্টিভেনামের অপর্যাপ্ততা।
আজকের ভিডিওতে সাপ এবং সাপের অ্যান্টিভেনাম সম্পর্কে বলা হবে। আমি জুম্মান আছি আপনাদের সাথে, আপনারা দেখছেন “বিজ্ঞান পাইছি”। প্রকৃতির প্রত্যেকটি প্রাণী তার খাদ্যকে আয়ত্তে আনার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। যেমন, মানুষ হাত ব্যবহার করে, পাখির ঠোঁট ব্যবহার করে, গিরগিটি জিভ ব্যবহার করে। কিন্তু খেয়াল করুন, সাপের এমন বিশেষ কোনো অঙ্গ নেই, যার ফলে প্রকৃতিতে টিকে থাকার যুদ্ধে সাপ ভিন্নভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এর দেহে এমন কেমিক্যাল তৈরি হয়েছে যা শিকারের শরীরে প্রবেশ করলেই শিকার মারা যায়, যাকে আমরা বলছি বিষ বা ভেনম।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভেনম এবং পয়জন দুইটি শব্দেরই বাংলা হচ্ছে ‘বিষ’, কিন্তু ভেনম এবং পয়জনের বিষক্রিয়ার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ভেনম রক্তের সংস্পর্শে বিষক্রিয়া প্রদর্শন করে, অন্যদিকে পয়জন নাকের মাধ্যমে নিঃশ্বাস নেওয়া, মুখের মাধ্যমে খেয়ে ফেলা কিংবা ত্বকের সংস্পর্শে বিষক্রিয়া প্রদর্শন করে। তবে আজকের আলোচ্য বিষয়ে মূলত ভেনম, আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে স্নেক ভেনম। স্নেক ভেনমে এমন সব প্রোটিন থাকে যা মূলত চারভাবে আপনাকে মেরে ফেলতে পারে।
প্রথমত নিউরোটক্সিন, যা আপনার নার্ভাস সিস্টেম সেই সাথে ব্রেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কিং কোবরা। দ্বিতীয়ত হেমোটক্সিন, যা রক্ত জমাট বাঁধায় বাধা প্রদান করে, সেই সাথে শরীরের অভ্যন্তরে রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ফলাফল, আক্রান্ত প্রাণী রক্তশূন্যতায় মারা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে রাসেল’স ভাইপার।
তৃতীয়ত সাইটোটক্সিন, যা কোষকে আক্রান্ত করে। ফলাফল, কোষ মারা যায়। এতে আক্রান্ত স্থান ফোস্কার মতো ফুলে ওঠে এবং এমন ক্ষেত্রে আক্রান্ত অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে র্যাটলস্নেক। চতুর্থত মাইওটক্সিন, যা মাংসপেশীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এমন ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণী প্যারালাইজড হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে সমুদ্রের হাইড্রোফিশ সাইনোসিংকার্ডস স্নেক। এই চার ধরনের বিষের বাইরেও স্নেক ভেনমে আরো বিভিন্ন ধরনের বিষ থাকতে পারে। এবং কোনো একটি বিষাক্ত সাপে যে এই চারটি প্রোটিনের যেকোনো একটি থাকবে তা কিন্তু নয়, একাধিক তো বটেই, কিছু ক্ষেত্রে এই চারটি সহ আরো কিছু প্রোটিন থাকতে পারে। যার ফলে সাপে কামড়ানোর চিকিৎসা খুবই জটিল বিষয়।
বিষধর সাপ কামড়ালে এর মূল ওষুধ হচ্ছে ওই সাপের অ্যান্টিভেনাম যা মূলত এক ধরনের অ্যান্টিবডি। আমাদের শরীরে যখন কোনো একটি জীবাণু প্রবেশ করে তখন সেই জীবাণুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আমাদের শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা শুধুমাত্র ওই স্পেসিফিক জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে এবং জীবাণুটিকে নষ্ট করে দেয়। এখন কোন কারণে যদি আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম না হয় বা পর্যাপ্ত তৈরি করতে না পারে, সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে আলাদাভাবে অ্যান্টিবডি শরীরের প্রবেশ করাতে হয় বা পুশ করতে হয়। এখন কথা হচ্ছে, শরীর তাৎক্ষণিকভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে না, শরীরের নতুন কোন একটি জীবাণু প্রবেশ করার পর শরীর সেটাকে চিহ্নিত করে এবং তারপর অ্যান্টিবডি তৈরি করতে কিছুটা সময় নেয়।
এখন কোনো একটি নতুন জীবাণুর বিপরীতে শরীর যদি অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলতে পারে, তবে পরবর্তীতে ওই জীবাণুটি ওই মানুষটিকে আর আক্রান্ত করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে, কারো যদি একবার চিকেন পক্স বা জলবসন্ত হয়, তবে দ্বিতীয়বার আর ওই মানুষটির জলবসন্ত হবে না। কথাটি কিন্তু অনেকাংশে সত্য। কারো দ্বিতীয়বার জলবসন্ত হয়েছে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। এর কারণ হচ্ছে, একবার জলবসন্ত হলে শরীর জলবসন্তের জীবাণু চিহ্নিত করে রাখে এবং এর বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। যার ফলে দ্বিতীয়বার জলবসন্তের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে শরীর সাথে সাথে এটাকে চিহ্নিত করতে পারে, যার ফলে সাথে সাথে অ্যান্টিবডিও তৈরি করতে পারে। ফলে দ্বিতীয়বার জলবসন্ত হওয়াটা খুবই দুর্লভ।
এখন অ্যান্টিবডির এই বিষয়গুলোর সাথে সাপের বিষের কী সম্পর্ক সেটা বলা যায়। স্নেক ভেনম থেকে আমাদের শরীরে যে বিষ বা জীবাণু প্রবেশ করে তা আমাদের শরীরের জন্য সম্পূর্ণ অপরিচিত, ফলে শরীর এর বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে স্নেক ভেনম শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে অকার্যকর করে ফেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে, যার ফলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। তার মানে সাপের কামড়ের সমাধান হচ্ছে, শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করার অপেক্ষা না করে বাইরে থেকে শরীরে অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করা। এখন বাইরে থেকে যে অ্যান্টিবডি দেওয়া হবে, সেটাই হচ্ছে অ্যান্টিভেনাম।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কোন একজন মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে অ্যান্টিভেনামের মাধ্যমে যদি বেঁচে যান, তবে ওই ব্যক্তির শরীর কি দ্বিতীয়বার সাপের কামড়ে নিজ থেকেই অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’, দুইভাবে দেওয়া সম্ভব। প্রথমে উত্তর ‘হ্যাঁ’ কোন ক্ষেত্রে হবে তা বলা যাক। মনে করুন, কোন একজন মানুষ খুবই অল্প পরিমাণ রাসেল’স ভাইপারের ভেনম শরীরে নিয়েছেন এবং পরিমাণটা এতই অল্প যে তা ওই ব্যক্তির শরীরে খুব একটা ক্ষতি করতে পারবে না। এমন ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির শরীর রাসেল’স ভাইপারের ভেনমের বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি করার যথেষ্ট সময় পাবে এবং অ্যান্টিবডি তৈরিও করবে। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি যদি আবার অল্প পরিমাণ রাসেল’স ভাইপারের ভেনম শরীরে নেন, তাহলে আবার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করবে। এইভাবে ওই ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন অল্প করে রাসেল’স ভাইপারের ভেনম শরীরে নিতে থাকেন, একসময় ওই ব্যক্তির শরীর রাসেল’স ভাইপারের বিষের বিপরীতে রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ওই ব্যক্তির শরীর একপর্যায়ে এমন হবে যে, রাসেল’স ভাইপারের কামড় থেকে নির্গত ভেনামের বিপরীতে ওই ব্যক্তির শরীর যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এবার প্রশ্নের উত্তর ‘না’ কোন ক্ষেত্রে হবে তা বলা যাক। কোন একজনকে প্রথমবার রাসেল’স ভাইপার কামড়ালে ওই ব্যক্তিকে যদি অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সুস্থ করে ফেলা হয়, তবে ওই ব্যক্তির শরীর কিন্তু রাসেল’স ভাইপারের বিষের সাথে পরিচিত হয়ে নিজ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি করার সুযোগ পাবে না। তার মানে ওই ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার রাসেল’স ভাইপার কামড়ানো মানে প্রথমবারের মতোই এফেক্ট তৈরি হওয়া। সুতরাং, এমন ক্ষেত্রে সাপে কামড়ালেই শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করবে না এমনটাই বলা যায়।
তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সাপের কামড়ের বিপরীতে আমাদের শরীর নিজ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি করার সময় পায় না, সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে অ্যান্টিবডি বা অ্যান্টিভেনাম শরীরে প্রয়োগ করতে হয়। এখন এই যে বাইরে থেকে শরীরে অ্যান্টিবডি বা ভেনম প্রয়োগ করা হবে, এই অ্যান্টিবডি বা ভেনম কীভাবে উৎপাদন করা হয়? ঘরে বসে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজে ওষুধসহ যাবতীয় হেলথ কেয়ার এবং ডিউটি কেয়ারের প্রোডাক্ট অর্ডার করতে পারবেন আরোগ্য অ্যাপে। আরোগ্যতে প্রতিটি ঔষধের বিস্তারিত বিবরণ, জেনেরিক অনুযায়ী বিকল্প কোম্পানির ঔষধের বিবরণ ও দাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারবেন। এছাড়াও প্রতি অর্ডারে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট, ক্যাশব্যাক এবং ফ্রি হোম ডেলিভারির মতো সুবিধা থাকছে। আরোগ্যতে আরো থাকছে স্বনামধন্য ডায়াগনস্টিক থেকে ল্যাব টেস্ট সুবিধা এবং সেটা ঘরে বসেই। ঢাকা শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে তাদের দক্ষ ফ্লেবোটোমিস্ট আপনার বাসায় গিয়ে স্যাম্পল কালেক্ট করবে। পরবর্তীতে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা রিপোর্টটি ভেরিফাই করে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে অনলাইন কপি সরবরাহ করা হবে। অ্যাপটি ইন্সটলের সাথে সাথে চল্লিশ টাকা বোনাস পেতে ডিসক্রিপশন বক্সে দেওয়া লিংক থেকে অ্যাপটি ইন্সটল করুন অথবা অ্যাপ স্টোরে ‘আরোগ্য’ লিখে সার্চ করুন এবং বোনাসের জন্য অ্যাপের রেফার বক্সে ‘বিজ্ঞান পাইছি’ কোডটি ব্যবহার করুন।
আঠারোশো নব্বই সালে ফরাসি সাইন্টিস্ট অ্যালবার্ট ক্যালমেট সর্বপ্রথম অ্যান্টিভেনাম আবিষ্কার করেন। তিনি প্রথমে খরগোশের শরীরে খুবই অল্প পরিমাণ, মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য তিন মিলিগ্রাম কিং কোবরা সাপের বিষ প্রয়োগ করেন এবং খেয়াল রাখেন এতে খরগোশের শরীরে কেমন প্রভাব করছে। এরপর প্রতি সপ্তাহে কিছুটা করে পরিমাণ বাড়িয়ে খরগোশের শরীরে কোবরার বিষ প্রয়োগ করতে শুরু করেন। এইভাবে আট মাস পর খরগোশটি পঁয়ত্রিশ মিলিগ্রাম কোবরার বিষ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। এই পঁয়ত্রিশ মিলিগ্রাম বিষ কিন্তু খরগোশের বিপরীতে খুবই বিশাল পরিমাণ। অর্থাৎ যে পরিমাণ বিষ একটি খরগোশকে মারতে পারে তার বিপরীতে পঁয়ত্রিশ মিলিগ্রাম প্রায় পনেরো গুণ। তার মানে, অল্প অল্প করে ভেনম প্রয়োগ করার ফলে খরগোশের শরীরে কোবরা ভেনমের বিপরীতে ইমিউন সিস্টেম ডেভেলপ করে, অর্থাৎ যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হয় যা কোবরা ভেনমকে নিশ্চিহ্ন করে। এভাবেই আবিষ্কার হয় অ্যান্টিভেনাম। বর্তমানে মূলত ঘোড়ার মাধ্যমে বড় স্কেলে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করা হয়।
যেমন, ইংল্যান্ড টাইপেনের অ্যান্টিভেনাম তৈরির জন্য অল্প অল্প করে ইংল্যান্ড টাইপেনের ভেনম ঘোড়ার শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এতে ঘোড়ার শরীরে ইংল্যান্ড টাইপেনের ভেনমের বিপরীতে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করে। এভাবে ঘোড়ার শরীরে যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পর ধাপে ধাপে ঘোড়ার রক্তের শুধুমাত্র প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে এই প্লাজমা পিউরিফাই করে বরাবর সিটিকাল গ্রেডের ইংল্যান্ড টাইপেনের অ্যান্টিভেনাম তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে ঘোড়া ব্যবহারের কারণ হচ্ছে, ঘোড়ার শরীরে প্রচুর পরিমাণ রক্ত থাকে, যার ফলে বেশি পরিমাণ অ্যান্টিভেনাম উৎপাদন করা যায়। এখানে খেয়াল করুন, ইংল্যান্ড টাইপেনের অ্যান্টিভেনাম কিন্তু অন্য সাপের ক্ষেত্রে কাজ করবে না। তার মানে, প্রত্যেকটি বিষধর সাপের বিপরীতে আলাদা করে অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে হয়। এর কারণ হচ্ছে, সাপের ভেনামের কেমিক্যাল স্ট্রাকচার, সাপটি কেমন স্থানে বসবাস করে, কোন সাইজের প্রাণী শিকার করে বা কেমন বৈশিষ্ট্যের প্রাণী শিকার করে এই বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করে।
যেমন, অস্ট্রেলিয়াতে তিন ধরনের টাইপেন সাপ রয়েছে। সেন্ট্রাল র্যাঞ্জের টাইপেন যা অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চলে থাকে। কোয়েস্টন টাইপেন যা অস্ট্রেলিয়ার উত্তর এবং পূর্ব সমুদ্র উপকূলে থাকে। ইংল্যান্ড টাইপেন যা অস্ট্রেলিয়ার এই মধ্যভাগের অঞ্চলে থাকে। এখন এই তিন ধরনের টাইপেনের শিকারের সাইজ এবং ধরন প্রায় একই রকম হওয়ার সত্ত্বেও এদের ভেনামে থাকা কেমিক্যালে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন, সেন্ট্রাল র্যাঞ্জ টাইপেনের ভেনামে ব্ল্যাক মাম্বার মতো আলফা নিউরোটক্সিনের পরিমাণ বেশি থাকে। আবার কোয়েস্টন টাইপেনে বেটা নিউরোটক্সিনের পরিমাণ বেশি থাকে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড টাইপেনে আলফা এবং বেটা নিউরোটক্সিনের পরিমাণ প্রায় সমান সমান থাকে। তাহলে এখানে খেয়াল করুন, একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই সাপের বিভিন্ন প্রজাতির ভেনমের মধ্যে কী পরিমাণ বৈচিত্র্য রয়েছে। যার ফলে, এক্স্যাক্টলি কোন সাপ দংশন করেছে এটা যদি জানা থাকে, তাহলে চিকিৎসা দেওয়াটা তুলনামূলক সহজ হয়।
সেই সাথে এখানে আরেকটি বিষয় বলা দরকার, এক দেশের সাপের অ্যান্টিভেনাম অন্য দেশের সাপের বিপরীতে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এবং এজন্যই আঞ্চলিক সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করার পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যাইহোক, এবার আমাদের দেশের আলোচিত রাসেল’স ভাইপার সম্পর্কে বলা যাক। ভাইপার প্রজাতির বহু সাপ পৃথিবীতে রয়েছে, যেমন পিট ভাইপার, গ্যাবন ভাইপার, ইউরোপিয়ান ভাইপার, সাহারান হর্নেড ভাইপার, মরিস ভাইপার। তেমনি আমাদের অঞ্চলের রাসেল’স ভাইপার একটি। এই সাপটি বহুকাল আগে থেকেই আমাদের অঞ্চলে ছিল এবং এটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলের সাপ। রাসেল’স ভাইপার যে বহুকাল আগে থেকেই আমাদের অঞ্চলে ছিল তা এর নামকরণ থেকে বুঝতে পারা যায়। ব্রিটিশ শাসন আমলে স্কটিশ সার্জন প্যাট্রিক রাসেল উপমহাদেশে এসেছিলেন সাপ সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য এবং তার নাম অনুসারেই সতেরোশো ছিয়ানব্বই সালে রাসেল’স ভাইপারের নামকরণ করা হয়।
আমাদের দেশে এই সাপের আঞ্চলিক নাম হচ্ছে চন্দ্রবোড়া যা আমাদের দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে পাওয়া যেত। দুই হাজার দুই সালে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট বাংলাদেশের রাসেল’স ভাইপার বিলুপ্ত হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সাপ ছড়িয়ে পড়ার সংবাদ সামনে আসছে। যার ফলে মানুষের মধ্যে এই সাপ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবশ্য আতঙ্ক তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কোন একটি বিষধর সাপ দংশনের পর প্রাথমিক কাজ হচ্ছে, আক্রান্ত স্থান নাড়াচাড়া না করে যত দ্রুত সম্ভব অ্যান্টিভেনাম প্রয়োগ করা। এখন মনে করুন, প্রত্যন্ত কোন একটি চরে একজন মানুষকে রাসেল’স ভাইপার দংশন করেছে, সেক্ষেত্রে তাকে হাসপাতালে আনতেই অনেক সময় লাগবে। তার উপর আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন সেবা দিয়ে থাকে সে সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত, ফলে হাসপাতালে আসার পরেও ওই আক্রান্ত ব্যক্তি অনিশ্চয়তায় থাকবে এই ভেবে যে তার যথার্থ চিকিৎসা হচ্ছে কিনা। এবং এই সকল বাস্তবতার কারণেই রাসেল’স ভাইপারের আতঙ্ক দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
এখন বাংলাদেশে রাসেল’স ভাইপারের অ্যান্টিভেনাম সম্পর্কে বলা যাক। বাংলাদেশের রাসেল’স ভাইপারসহ অন্যান্য বিষধর সাপের জন্য ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনাম সম্পর্কিত তথ্যগুলো বিবিসির একটি রিপোর্ট থেকে বলছে। গোখরা সাপ দংশনের গড় আট ঘণ্টা, কেউটে সাপ দংশনের আঠারো ঘণ্টা এবং চন্দ্রবোড়া বা রাসেল’স ভাইপার দংশনের গড় বারো ঘণ্টা পর আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। যার ফলে এই সময়সীমার মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব অ্যান্টিভেনাম প্রয়োগ করা জরুরি। এখন বাংলাদেশের স্থানীয়ভাবে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করা হয় না। বাংলাদেশের সাপের কামড়ের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনাম মূলত ভারত থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্থানীয় সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনাম তৈরি করতে হবে। এক দেশের সাপের অ্যান্টিভেনাম অন্য দেশের সাপের বিপরীতে ভালোভাবে কাজ করবে না। এরপরও বাংলাদেশে বছরের পর বছর ভারতের অ্যান্টিভেনাম দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখনো নিজেদের সাপের বিষের মাধ্যমে অ্যান্টিভেনাম উৎপাদন করতে না পারাটা এক ধরনের ব্যর্থতা। অন্যদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিও এ বিষয়ে আগ্রহী নয়, কারণ সাপের কামড়ের শিকার মূলত নিম্নবিত্তের মানুষ, যারা উচ্চ মূল্যের অ্যান্টিভেনাম কেনার ক্ষেত্রে কম আগ্রহী হবেন। ফলে অ্যান্টিভেনাম উৎপাদন করে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো লাভবান হতে পারবে না। যে সকল ক্ষেত্রে মূলত সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়া এমন একটি দেশ যাকে বিভিন্ন বিষধর প্রাণীর আবাসস্থল বলা হয়। এরপরও কিন্তু ওই দেশের মানুষ বিষধর প্রাণী নিয়ে এতটা আতঙ্কিত থাকে না। কারণ সে দেশের মানুষের মধ্যে এমন অনিশ্চয়তা থাকে না যে বিষাক্ত প্রাণী কামড়ালে সে যথেষ্ট চিকিৎসা পাবে না। তাদের দেশে বিষাক্ত প্রাণী কামড়ালে অ্যান্টিভেনাম বিনামূল্যে দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও বিনামূল্যে দেওয়া হয়, তবে ওই যে আস্থা এবং আন্তরিকতার সংকট, যা আমাদের আতঙ্কিত করে।
আসলে প্রকৃতিতে কোন কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। প্রত্যেকটি প্রাণী, উদ্ভিদ অনুযায়ী প্রয়োজনীয়। প্রকৃতি ভারসাম্য রক্ষায় প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। যেমন, বর্তমানে বেজি প্রায় দেখাই যায় না, যেখানে এই বেজির সাপের কামড়ে কিছুই হয় না। অর্থাৎ, বেজির ইমিউন সিস্টেম এমন যার সাপের বিষ প্রতিরোধে সক্ষম। তার মানে এটা সহজে বোঝা যায় যে প্রকৃতিতে সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বেজির ভূমিকা রয়েছে। এখন আর আগের মতো বেজি দেখা যায় না, যার ফলে সাপের সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়াও অবশ্য আরো বিভিন্ন কারণ রয়েছে। যাইহোক, পরিশেষে এটুকুই বলবো, সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। কেউ আক্রান্ত হলে আক্রান্ত স্থান নাড়াচাড়া না করে যত দ্রুত সম্ভব সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। কখনোই ভুল করেও ঝাড়ফুঁক বা ওঝার কাছে যাবেন না। এমনটা করা মানে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলা।
বর্তমান পৃথিবীর প্রতি তিনজনে একজন মায়োপিয়া সমস্যায় ভোগেন এবং ধারণা করা হচ্ছে, দুই হাজার পঞ্চাশ সাল নাগাদ এই সংখ্যাটি দাঁড়াবে প্রতি দুইজনে একজন। তার মানে মায়োপিয়াকে নীরব মহামারী বলা যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মায়োপিয়া কী এবং কী কারণে এত উচ্চহারে মায়োপিয়া বাড়ছে? মায়োপিয়া সম্পর্কিত এমন বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিত জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন।

