এইচএসসি পাশের পর ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতি ও সমস্যা সামলানো (University Admission Test Mental Preparation) সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুদের জন্য জরুরি। প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অনলাইনে আপনাকে অনেকে পড়াবে। আমরাও পড়াই। আমাদের কোর্স আছে, বই আছে, এক্সাম আছে।
শুধু পড়ালেই যদি মানুষজন চান্স পেত, তাহলে কিন্তু এমন কখনোই হতো না যে কয়েক লাখ পরীক্ষা দিয়ে কয়েক হাজার মানুষজন চান্স পাচ্ছে। আপনি এটাও বলতে পারেন, যারা যোগ্য, তারাই চান্স পাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আসন পূরণ না করেই ক্লাস শুরু করছে। সব যোগ্যরাই যে চান্স পাচ্ছে, এমনটা নয়।
অন্তত ঢাকায় পাঁচ লাখ মানুষজন কোচিং করতে আসে। তারা একই কোচিংয়ে পড়ে, একই উদ্ভাসে পড়ে, একই সানরাইজে এক্সাম দেয়, একই মেটেরিয়াল দেখে। এই একই জিনিসপত্র করা সত্ত্বেও তারা চান্স পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না?
কারণ হলো, ভর্তি পরীক্ষায় শুধুমাত্র আমার পড়ার দিকটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভর্তি পরীক্ষার একটা অনেক বড় মানসিক দিক আছে। আর এই মানসিক দিকটাকে আমরা অনেকে গুরুত্ব দেই না।
যেমন এই জেনারেশনে ডিপ্রেশন, লোনলিনেস, ইনসমনিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি—এটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পুরো সময়টা জুড়ে আমাদের এই সমস্যাগুলো নিয়ে কারো সাথে কথা বলা যায় না। কারণ আমি কোচিং সেন্টারে গিয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করব যে ভরকেন্দ্রের শূন্যে কী হবে, নাকি বলব যে গত চার দিন যাবত বিষণ্নতার জন্য এক ঘণ্টা পড়তে পারছি না?
আমি আমার ফলাফলের আতঙ্কে অস্থির। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এটাই হলো এডমিশনের আয়োজন।
ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতি
আমাদের শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক হলো গিভ অ্যান্ড টেক: টাকা দেব, পড়াবে। ব্যস, এটুকুই। তাই আমাদের আসলে ঘনিষ্ঠ এরকম কেউ নেই, যার সাথে আমরা মনের কথা শেয়ার করব। সেই জায়গায় আমি আনাস ফেরদৌস। আমি আপনাদের শিক্ষক কোনো কালেই ছিলাম না, আমি আপনাদের ভাই ছিলাম।

আমি নিজে যেগুলো ফেস করেছি, বিগত বছরগুলোতে আমরা শিক্ষার্থীদেরকে যেগুলো ফেস করতে দেখেছি, সেগুলো নিয়ে সবকিছু আলোচনা করব এবং সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব। মনে রাখতে হবে, এই লেখা থেকে আপনার সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে- এমনটা নয়।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, মানসিক সমস্যা বা দুঃখের একটা ভালো দিক হলো, যখন আমরা কাউকে দেখি যে সে আমার সমস্যাও ফেস করছে, তখন মনে হয় জিনিসটা তো আমার পাশেও বসে আছে। এটা নিজেকে বাঁচানোর অনেক বড় শক্তি যোগায়। চলুন শুরু করি।
আরও পড়ুনঃ এইচএসসি আইসিটির সাজেশন – ৮ মিনিটে পুরো প্রস্তুতি
আত্মবিশ্বাস (Confidence)
আজকে প্রথম যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে, সেটা হলো আত্মবিশ্বাস। দেখুন, এমন অসংখ্য ঘটনা আছে না যে একজন শিক্ষার্থী যে পরীক্ষা দিচ্ছে, সে সব জায়গাতেই চান্স পাচ্ছে। আবার এমন দেখা গেছে যে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু কোনো জায়গাতেই চান্স পাচ্ছে না।
প্রথম শিক্ষার্থীটা হয়তো অনেক ক্ষেত্রে কম পড়েছে। দ্বিতীয় শিক্ষার্থীটা বেশি পড়েছে, তবুও চান্স পাচ্ছে না। এই দুজন মানুষের মধ্যে প্রস্তুতিতে খুব একটা পার্থক্য থাকে না। এই পার্থক্যটা তৈরি হয় একটা জায়গায়- সেটা হলো মাইন্ডসেট এবং আত্মবিশ্বাসের স্তর।

আপনি দেখবেন, যারা চান্স পায় না, তাদের সাথে পাঁচ মিনিট কথা বললে তারা বলবে- “একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট লাগবে”। “কোনোমতে পাস মার্কটা যদি ওঠে”। “এইচএসসি-তে ফোর পয়েন্ট আসবে তো নাকি? পরীক্ষা দিতে পারব তো?”। ওর কথাবার্তাই মানে ওর লেভেলটাই কিন্তু এইটুকু।
মনে রাখবেন- আপনি আপনার সর্বোচ্চ প্রত্যাশাকে কখনো অতিক্রম করতে পারবেন না (“You’ll never exceed your highest expectation”)। অর্থাৎ, আপনি যদি নিজেকে চিন্তা করেন যে আমি একশো পর্যন্ত যাব, নিজেকে বিলিভ করেন। আপনি হয়তো ৭০, ৮০, ৯০ পর্যন্ত যাবেন, ম্যাক্স গেলে একশো যাবেন। কিন্তু কোনোদিন একশো দশ যাবেন না।
যখন আপনার আত্মবিশ্বাসের স্তর শুরুতেই কম, আপনার অবচেতন মস্তিষ্কের একটা নোংরা ব্যাপার হলো যে, ওকে, আপনি যা ফিড করাবেন, ও বাস্তব জীবনে আপনাকে ওভাবেই চালাবে।
যেমন, আপনি পাঁচজন নামাজি হুজুরের সাথে থাকুন। আপনি হয়তো নিকৃষ্ট, খারাপ একজন মানুষ। আপনি পাঁচটা হুজুরের সাথে থাকুন, বেশি না—এক মাস। আপনি এক ওয়াক্ত করে নামাজ পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে ওদের মতো হয়ে যাবেন। গ্যারান্টি আপনি ভালো মানুষ হবেন।
কিন্তু আপনি পাঁচটা নেশাখোরের সাথে থাকুন। আপনি হয়তো খুব ভালো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি হুজুর টাইপের একজন মানুষ। আপনি পাঁচটা নেশাখোরের সাথে থাকুন। এক মাসও লাগবে না। খারাপ জিনিস আরও দ্রুত ধরে। সাত দিন বাড়ান, আপনি এর মধ্যে কোনো একটা খারাপ কিছু করে ফেলবেন। শেষমেশ নেশাখোরই হবেন।
আপনার মস্তিষ্ককে আপনি যা বোঝাবেন, আপনার আশেপাশে ওই ওই লেভেলের সিস্টেমটাই দিয়ে দেবে। সুতরাং, যখন আপনার আত্মবিশ্বাসের স্তর শুরু থেকেই কম, আপনার ফলাফলও শেষ পর্যন্ত কম হবে।
আরও পড়ুনঃ চ্যাটজিপিটি স্টাডি মডেল দিয়ে ১০ গুণ বেশি পড়াশোনা
কীভাবে আত্মবিশ্বাস বাড়াবেন?
ভাইয়া, আত্মবিশ্বাস তো পাই না। এটা স্বাভাবিক প্রশ্ন। আত্মবিশ্বাস আসার কয়েকটা পয়েন্ট আজকে শিখে রাখুন।
১. কঠোর পরিশ্রম (Hard work): প্রথম পয়েন্ট হলো কঠোর পরিশ্রম। যখন আপনি পাগলের মতো খাটেন, আপনার মস্তিষ্ক জানে যে আমি আমার যুদ্ধটার জন্য প্রস্তুত। ধরে নিন, আপনার সাথে আমার মারামারি লাগছে। এখন ধরুন, আমি জিম করি, আমি শক্তিশালী।
আমি জানি আমি আপনার চেয়ে দ্বিগুণ সাইজের একজন মানুষ। আপনি জিম-টিম করেন না, আপনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আপনি স্বাভাবিকভাবেই বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকবেন না। আমি আত্মবিশ্বাসী থাকব।
কিন্তু ধরে নিন যে আমি বিশাল মোটা, বিশাল দানব। আপনি কারাতে জানেন, এমএমএ জানেন। আপনি আমাকে মেরে ভাঁজ করে রাখবেন। আমি যত শক্তিশালীই হই না কেন। কেন? কারণ আপনি জানেন, আপনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন, আপনি দক্ষ। তাই আপনি আত্মবিশ্বাসী।
আত্মবিশ্বাস আসে যখন আপনি কঠোর পরিশ্রম করেন। আপনার মস্তিষ্ক জানে, আমি এই সমস্যার জন্য প্রস্তুত।

২. সফলতা (Success): দুই নাম্বার পয়েন্ট হলো সফলতা। এই পয়েন্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটা অনেকে ভুল করে। আপনি চিন্তা করুন, যদি আপনি এডমিশনের সময় থেকে প্রত্যেকটা দৈনিকে কম নাম্বার পান, প্রত্যেকটা সাপ্তাহিক পরীক্ষায় আপনার সিরিয়াল দশ হাজারের পরে চলে যায়, আপনি কি চান্স পাবেন বলে মনে করেন?
যখন আপনার পুরো জীবনজুড়ে শুধু ব্যর্থতা, ব্যর্থতা, ব্যর্থতা—আপনার মস্তিষ্ক কী দেখে আত্মবিশ্বাসী হবে? স্বাভাবিক, হবে না তো। আপনার তো কিছু নেই যেটা নিয়ে আপনি আত্মবিশ্বাসী হবেন। আপনি কি সালমান খান? আপনি কি হৃতিক রোশন?
আপনার তো চেহারাও নেই। আপনার কি খুব টাকা আছে? আপনি কি মুকেশ আম্বানির ছেলে? তাহলে আপনার মস্তিষ্ক কী নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হবে?
একটা জিনিস হলো ক্ষুদ্র সফলতা (Micro Success)। আপনি নিজেকে ছোট ছোট সফলতা দিন। আমি কী করতাম জানেন? আমি উদ্ভাসে পরীক্ষা দিতাম। কিন্তু আমি জানতাম আমি উদ্ভাসে তুখোড় ব্যাচের কাছাকাছিও নই। উদ্ভাসে আমার স্থান ছিল সতেরোতম। তারপর বুয়েটে আমার অবস্থান ছিল ২৮৭।
যদিও বুয়েট, মেডিকেল, হাইড্রোনার চান্স পেয়েছি। এটা তো ভালো অবস্থান না। আমি তো ভালো ছাত্র না। আমি কি বুয়েটের শীর্ষ দশ জনের মতো মেধাবী? না। তো আমি কী করব? আমি এখন তাদের সাথে পারব না।
তাহলে আমি কী করতাম জানেন? আমি ওমেকা, সানরাইজ, ইউসিসি-তে চলে যেতাম। হাজার-দুই হাজার টাকা নিয়ে। গিয়ে বলতাম যে আমি তো ভালো ছাত্র, সরকারি কলেজের ফার্স্ট বয়। আমি উদ্দেশ্য অনেক ভালো করতেছি। আপনারা আমাকে একটু কম টাকায় ভর্তি করিয়ে দিন না? পরীক্ষা দেব শুধু।
ওরা তখন এক-দুই হাজার টাকা নিয়ে আমাকে ভর্তি করিয়েছিল। তারপর আমি ইউসিসিতে পরীক্ষা দিছি। সেন্ট্রাল মিনিটে একবার প্রথম, একবার দ্বিতীয় হয়েছি। ইউসিসির প্রথম-দ্বিতীয় কি চান্স পাবে? না, পঁচিশ জন তো মরে গেছি। এরপর মনে করুন, মেডিকেল থেকেও পরীক্ষা দিই।
যত জায়গায় পারি, ছোটখাটো কোচিং সেন্টারে—অনেক ভাইয়া পরীক্ষা নেয়, বাসায় পরীক্ষা দেয়। তিনজনের মধ্যে আমার সবচেয়ে বেশি নম্বর। তাহলে আত্মবিশ্বাস পাব না? সুতরাং, আপনাকে মস্তিষ্ককে ক্ষুদ্র সফলতা দিতে হবে।
এইজন্য আপনারা বিভিন্ন বড় কোচিং সেন্টারে অবশ্যই পরীক্ষা দিবেন; অবশ্যই গোটা উদ্ভাস—উদ্ভাসের পরীক্ষা দিন। সেই সঙ্গে আপনি সানডে কোচিং সেন্টার বা একটা সার্ভিস সেন্টারে ভর্তি হয়ে যান।
কেন আপনি এখানে ভর্তি হবেন? কারণ আপনি আপনার আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারবেন। এবং আপনি যখন এরকম ছোট ছোট সফলতা মস্তিষ্ককে দিবেন, দেখবেন আপনি আত্মবিশ্বাসী হতে থাকবেন। আমি এজন্য বিনা কারণে বিভিন্ন অলিম্পিয়াড দিয়েও হারাতাম।
অর্থাৎ, নিজেকে বারবার বলুন— “আমি পারব, আমি পারব, আমি পারব”। কেউ বলুক না বলুক, আমি নিজেই নিজের ওপর বিশ্বাস করব। কেউ আপনার উপর বিশ্বাস করে না, ভাই; আপনি নিজের উপর বিশ্বাস করুন। আপনার স্ব-আত্মবিশ্বাস আগে থাকবে, তারপর বাকি আত্মবিশ্বাস পরিষ্কার হবে।
৩. দৃশ্যায়ন (Visualization): এরপর আসে দৃশ্যায়ন। আমার মানসিক কৌশলগুলো আগে যদি আপনারা অনুসরণ করে থাকেন, খেয়াল করবেন আমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে অনেক কথা বলি। আমি একটি ভিডিও লেকচার নিয়েছি—পঁচিশ মিনিটের সেশন—যেটা আমি সোহাগ ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি।
তিনি আরেকজন বড় মেন্টাল কোচের কাছ থেকে শিখেছেন। মানসিক কৌশল, এডমিশন, একাডেমিক— সবকিছু মিলিয়ে মানসিক প্রস্তুতি জীবনে খুব জরুরি। আপনি মানসিকভাবে শক্তিশালী না হলে দুনিয়াতে টিকে থাকতে পারবেন না।
এই বিষয়টির উপর আমার একটি মানসিক কৌশলের দল আছে, যা আমি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে এসেছি। এখানে কেবল পড়াশোনা নয়, বরং মানসিক প্রস্তুতিই মূল বিষয়। বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি—আপনি যদি রেকর্ডের সাইটটা সেশন করার পরেও পরিবর্তন না পান, তাহলে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত।
এর বাইরেও আপনি তিনশো’র বেশি অতিরিক্ত নির্দেশনামূলক ভিডিও পাবেন, যেগুলো প্রকাশ্যে উপলব্ধ নয়। দৃশ্যায়ন আমরা সোহাগ ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছি। আমি নিজে না জেনে ওই কাজটা বারবার করতাম।
ভার উত্তোলন (Power Lifting) করার সময় আমি প্রশিক্ষককে বলতাম, “ভয় লাগে, ওজনটা উঠবে না”। তিনি বলতেন, “চিন্তা করবি না; তোকে ওটা র্যাক করা, তোকে উঠিয়ে ফেলতে বলি, তারপর সেলিব্রেট করবি”। আমি ভর্তি পরীক্ষার আগে চিন্তা করতাম না। আমি বিশ্বাস করে কেন্দ্রের সামনে নিজেকে কল্পনা করতাম যে আমি এখানে চান্স পেয়ে গেছি, অবস্থান নিয়ে বাড়ি ফিরছি।
নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান—তার একটা পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি মাথায় রাখুন। বুয়েটে চান্স পাওয়ার পরে আপনি ওরিয়েন্টেশনে বসে আছেন; বাবা-মা আপনাকে নিয়ে খুশি; আপনি এসির ভবনে ক্লাস করছেন; আপনি ডাক্তার হয়ে মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন—এই দৃশ্যগুলো ভেবে দৃশ্যায়ন করুন।
বিষণ্নতা (Depression)
এরপর আসি বিষণ্নতা। বিষণ্নতা এখন একটি ফ্যাশনের ভুল ধারণা হয়ে গেছে। কিছু হলে সবাই বলে, “আমার ডিপ্রেশন হয়ে গেছে”। আপনারা যারা আসলেই জানেন না—বিষণ্নতার একটা বড় ধারা আছে, ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতা, যা গুরুতর। সেটি বিনা চিকিৎসায় সারে না; ডাক্তার এবং ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা লাগে।
ঠিক যেমন হৃদরোগ ব্যায়ামে সারানো যায় না—ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতাও ওষুধ এবং থেরাপি ছাড়া সমাধান হয় না। কিন্তু আমাদের সমাজে সমস্যা হলো—সবার কাছে “বিষণ্নতা” একটি হালকা লেবেল। “আরে ভাই, তুই ডিপ্রেশন চিনিস কি?”—এমনটা বলা হয়।
অনেকেই ইন্টারনেট দেখে বলে, “বিষণ্নতা কাটিয়ে ঠিক হয়ে গেছি”, যা ভুল।
আপনাদের মূলত আমি বলছি—এইটা সবই বিষণ্নতা না। বিষণ্নতার মূল কারণগুলো হলো: ডোপামিনের চরম প্রকাশ, কাজ না করা এবং আলস্য। আমাদের প্রজন্মের বড় সমস্যা—আগে ডোপামিন পেতে বাইরে যেতে হতো, খেলতে হতো।
এখন দশ বছরের বাচ্চা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই অসীম ডোপামিন পায়। প্রতি স্ক্রলে কোটি কোটি ছবি, লাখ লাখ প্রকাশ। ফেসবুক স্ক্রল করলে যে পরিমাণ ডোপামিন পান, সেই পরিমাণ ডোপামিন পেতে আমাদের পূর্বপুরুষদের হয়তো ধান চাষ করে তিন মাস অপেক্ষা করতে হতো।
অর্থাৎ, আপনার মস্তিষ্ক পুরা ফাঁকা হয়ে গেছে—তার ফাঁকগুলোতে আপনি ভর্তি হতে বসে যান। আপনি দিনে দশ ঘণ্টা রুমের মধ্যে বসে স্ক্রল করেন। কোনোদিন সূর্যের আলোতে যাননি। সারাদিন রুমের মধ্যে বসে ফোন এরকম করেন। যার কারণে আপনার পড়ার শক্তি নেই।
কারণ বইয়ের মধ্যে ধারণাগত ডোপামিন আছে? উদ্ভাসের ধারণার ভেতরে ধারণাগত ডোপামিন আছে? সামনের এদের ফাউন্ডেশন বুকে কোথায় ডোপামিন আছে? নেই তো। আপনার মস্তিষ্ক তো ডোপামিনের প্রতি আসক্ত। সুতরাং, চিন্তা করেন—এইটাই করি। আমি পড়তে পারব না, ভালো লাগছে না—বিষণ্নতা।
দ্বিতীয় কারণ হলো আপনি কোনো কাজই নেন না। আপনি আমার এই লেখা দেখবেন, তারপর কী করবেন? আবার সেইম কাজই করবেন। আপনার যে চান্স পেতে হবে, আপনি পড়ছেন কতক্ষণ? কয়টা বই পড়া হয়েছে আপনার? কয় দিন কোচিংয়ে গুরুত্বের সাথে ক্লাস করেছেন? কোচিংয়ের পিছনের দিকে বসে ফোন চালান।
কোচিং বাদ দিয়ে আপনি যান চন্দ্রিমায়—কেমন করে হয়? আপনি কোনো কাজ নেন না তো। তৃতীয় যে পয়েন্টটা, সেটা হলো আপনি অলস তো, ভাইয়া। আপনি বিনা কারণে দিনে নয় ঘণ্টা ঘুমান।
আপনি কি জন সিনা যে আগে ব্যায়াম করতেছেন? রেসলিং করছেন? আপনার এত শক্তি ঘুমের দরকার? আপনি সারাদিন বসে বসে ফোন চালান আর ফাস্ট ফুড খান। কম করে আপনার ঘুম লাগে নয় ঘণ্টা। আপনার ঘুমটা তো ভাইয়া ফ্যাশন।
বুঝতেছেন যে কেন আপনার ডোপামিন এই স্তরে আপনার মস্তিষ্কটাকে ফ্রাই করতে পারছে? এটার মূল কারণ হলো আপনি আপনার মস্তিষ্কটাকে এই জায়গায় নিয়ে গেছেন। আপনার মস্তিষ্ক এখন কোনো কিছুতেই উত্তেজিত হচ্ছে না, কারণ ওকে আপনি এত উত্তেজনা দিয়েছেন।
এখন ধরুন, আমি এমন একটা উদাহরণ দেই। মনে করুন, সে হলো সৌদি আরবের একজন। পুরো মরুভূমিতে থাকে। ওদের তাপমাত্রা অনেক বেশি। এখন যদি ওকে বাংলাদেশে আনি, সে তো বলবে, “আরে, খুব ঠান্ডা, খুব সতেজ”। কেন?
কারণ বাংলাদেশের তাপমাত্রা তো ওদের চেয়ে কম। কিন্তু আমরা যদি সৌদিতে যাই, তো পাগল হয়ে যাব না? কারণ ওর বেসলাইন পয়ঁত্রিশ-ছত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট হয়েছে। আপনি আপনার মস্তিষ্কের বেসলাইন নিয়ে গেছেন ডোপামিনে পাগল।
এই কারণে আপনি এখন পড়াশোনা করতে পারবেন না। সুতরাং, প্রথম যেটা করতে হবে, আপনার যদি বিষণ্নতা থাকে—ডোপামিন ডিটক্স করুন, ভাইয়া। ডোপামিন ডিটক্স আপনার এডমিশন টাইমে স্ক্রিনের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসুক। কেন ফেসবুক চালাতে নিষেধ করি? কেন হালকা স্ট্যান্ডার্ড অ্যাপ আছে?
অ্যাপের কারণে তো মেলা টাকা যায় আমাদের। কেন দেই? ফেসবুকে ক্লাস করিস না। ঢুকবেন না। ফেসবুক আনইনস্টল করুন। অ্যাপ থেকে রেকর্ড করা ক্লাস করুন। ইন্টারনেট ছাড়া ডাউনলোড করে নিন। ইন্টারনেট অফ করে দিন। সিম খুলে রেখে ওয়াইফাই ফেলে দিন। ডাউনলোড করা ক্লাস করুন। সমস্যা আছে? সমস্যা তো নাই।
এই কাজটা কেন করেন না আপনারা? আপনারা ডোপামিন ডিটক্স নিয়ে পড়াশোনা করবেন। এটা নিয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করতে পারব না। কিন্তু প্রথম কাজ—ডোপামিন ডিটক্স। দ্বিতীয় কাজ—সূর্যের আলো। অর্থাৎ, একটু বাইরে যেতে হবে।
আপনারা রুমের মধ্যে বসে বসে শুধু স্ক্রল করেন। কারো সাথে কথা নেই, দেখা নেই, সাক্ষাৎ নেই। বিষণ্নতা তো হবেই। মানুষ তো সামাজিক জীব, ভাইয়া। না হলে আমরা সবাই আলাদা থাকতাম। মিশুন, কথা বলুন, বাইরে যান। কাজ নিন। কঠোর পরিশ্রম করুন। জিমে যান, দৌড়ান।
আমি ভর্তি পরীক্ষার তিন দিন আগে ১১০ কেজি দিয়ে বেঞ্চ মেরেছি, কিছুই হয় নাই। আপনারা এগুলো যখন করবেন, আপনাদের মেজর টক দেখে সে বিষণ্নতা হয় না। আপনাদেরও না। ডোপামিন কমে যায়। কিন্তু আবার ফোন চালানো শুরু করবেন। এই একটা সত্য কথা বলি—বিষণ্নতা কি ফোন স্ক্রল করার সময় হয়? না।
রাত তিনটার দিকে তখন তো বিষণ্নতা হয়ে যায়। “হায় ভাই, অনলাইনে কেউ নাই। অনলাইনে কেউ পোস্ট করছে না”। তখন বিষণ্নতা হয়। এটাই তো আপনার হয়। কারণ কী? তখন আপনি একা। কিছু করার নাই। আর ডোপামিন পাচ্ছেন না। তখন বিষণ্নতা লাগে। দিনের বেলা তো ভাইয়া সক্রিয় সময় থাকে। সুন্দর স্ক্রল করে যেতেছেন—চলতেছে। তখন তো বিষণ্নতা কাজ করে না।
তার মানে আপনার বিষণ্নতা না তো, ভাইয়া। আপনার ডোপামিনটাই জাস্ট কেড়ে নিচ্ছে। আপনি পাগল হয়ে যাবেন। বুঝছেন বিষয়টা? আর যদি গুরুতর ক্লিনিক্যাল স্তরের বিষণ্নতা হয়—যদি আপনার এমন হয় যে বিষণ্নতার কারণে আপনি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, আপনি ঘুমাতে পারছেন না, আপনার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে, আপনি সামলাতে পারছেন না, আপনি পরামর্শ রাখতে পারছেন না—তাহলে সবসময় একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নিন।
মনোচিকিৎসক দেখান। একজন ভালো ডাক্তার দেখান। টাকা বেশি যাক, সমস্যা নেই। আপনি আগে। টাকাটা নয়। আপনার টাকা আজীবন আসবে। আপনি আগে বাঁচুন। আপনি সুস্থ থাকুন।
আরও পড়ুনঃ Winning Formula to BUET, Medical & DU Admission Preparation Strategy | ট্রিপলেট অ্যাডমিশন গাইড
শেষ পরীক্ষার লক্ষণ (Last Exam Syndrome)
এরপর আসি, সেটা শেষ পরীক্ষার লক্ষণ। এটা আগেই বলে রাখি, বাবারা। সেটা হলো, আপনাদের যত পরীক্ষা এগিয়ে আসবে, তত আপনার পড়ার পরিমাণ বাড়বে না। পড়ার পরিমাণ কমবে। মৌসুমের শুরুর দিকে বাঙালি কী করে জানেন? বাঙালির হলো প্রচেষ্টার কাজটা এরকম—মৌসুমের শুরুর দিকে, “হবে, হবে”।
বিজ্ঞপ্তি দিল, “দৌড় দাও, দৌড় দাও”। আবার পরীক্ষার সময় মনে হয়, “হবে, হবে”। অথচ মাঝে একটু থেমে যায়। এটাই। বিজ্ঞপ্তি দিলে আবার ফলাফলের দিন দেখবেন—পাগল হয়ে গেছে। পরীক্ষার আগে আপনার শক্তি কমে যায়। অথচ হিসাবে আপনার পরীক্ষার আগে শক্তি বাড়ার কথা। কী হলো তাহলে?
আচ্ছা, এজন্য শেষ পরীক্ষার লক্ষণ সম্পর্কে জানতে হবে। শেষ পরীক্ষার লক্ষণ হলো যখন পরীক্ষা কাছে আসে, আমাদের মস্তিষ্ক ভয় পায়। আপনি ভাস্কো-দা-গামা হতে পারেন, আপনি বুয়েটের প্রথম হতে পারেন—কিন্তু যদি বলেন আপনার বুয়েট পরীক্ষার আগের দিন বা রাতের বেলা ভয় লাগেনি—তাহলে আমি বলব, হয় আপনি পাগল, না হয় আপনি ফেরেশতা।
কারণ সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের ভয় লাগবে। টেনশন হবেই। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কথা হলো, এটা কতটুকু আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। শেষ পরীক্ষার লক্ষণ কার হয়? যে পরীক্ষা দেয় না। এটাই হলো মোড়।
অর্থাৎ, আপনি যদি উদ্ভাসে প্রতিদিন বা সপ্তাহে একটা করে সাপ্তাহিক পরীক্ষা দেন, আপনি যদি প্রতিদিন সানরাইজে পরীক্ষা দেন, উদ্দেশ্যে পরীক্ষা দেন, আরো কয়েকটা জায়গায় পরীক্ষা দেন, বাসায় নিয়মিত পড়াশোনা করেন—তাহলে স্বাভাবিকভাবে আপনার পরীক্ষার আগে আতঙ্ক লাগবে না। কারণ আপনি হালকা হালকা আতঙ্ক অনুভব করছেন আগেই।
উদাহরণস্বরূপ ধরুন, আপনাকে আমি নদীতে ফেলব। নদীতে মানে বুক-গলা পর্যন্ত পানিতে নিয়ে যাব। তার আগে আমি আপনাকে প্রথম দিন বালতির মধ্যে পানিতে বসিয়ে রাখব। তারপর সাঁতারের পুলে নিয়ে যাব, যে তিন-চার দিন কোমর পর্যন্ত পানিতে যাবে। তারপর বুক পর্যন্ত সাঁতারের পুলে নিয়ে গেলাম। তারপরে পুকুরে নিয়ে গেলাম, দাঁড়িয়ে থাকুন।
তখন আমি যদি নদীতে আপনাকে ফেলি, আপনি ভয় পাবেন খুব একটা না। কিন্তু আপনার কোনো বন্ধু যদি কোনো প্রশিক্ষণ না করে, সরাসরি নদীতে ফেলা হয়—ও তো আতঙ্কিত হবে, ডুবে যাবে। অথচ চাইলে ও দাঁড়াতে পারত।
আপনি নিজেকে ক্রমাগত ছোট ছোট ভয়ের মধ্যে উন্মোচন করুন। যে পরীক্ষা মোকাবেলা করতে করতে পরীক্ষা আমার কাছে খুব একটা আতঙ্ক লাগে না। আবার, তারপরও আতঙ্ক লাগবে। কারণ আমরা মানুষ। ভয় তো লাগবে, কিন্তু ভয়টা কতটুকু লাগতেছে, এটা বুঝতে হবে।
সুতরাং, শেষ পরীক্ষার লক্ষণ—যদি আপনি চান যে পরীক্ষার আগে আপনি বেশি করে পড়তে, শুরু থেকে পরীক্ষা দিন। বাঙালি কী করে? বাঙালি অনেক পড়ে। এডমিশন টাইমে কি নতুন পড়বেন? কী নতুন আছে?
আপনি তো দুই বছর পড়ছেন। আপনার কেন মনে হয় যে দুই বছরের পড়াই যথেষ্ট না? তিন মাসে এসে একদম আসমানী কিছু একটা শিখিয়ে দিবে? না, কিছুই হয় না ওরকম। ওই দুই বছরের পড়াটাকে একটু ভিন্নভাবে শেখানো হয়।
আরও পড়ুনঃ মেডিকেল কেমিস্ট্রির ২০০% গুরুত্বপূর্ণ টপিক – শিখা পরীক্ষার বর্ণ মনে রাখবে যেখাবে!
ধারাবাহিকতা (Consistency)
ধারাবাহিকতা কী জিনিস? আচ্ছা, ধারাবাহিকতার অনেকগুলো সংজ্ঞা হতে পারে। কিন্তু ধারাবাহিকতা আমি আপনাকে বাস্তব জীবনে একটা সংজ্ঞা দেই। তো, বইয়ের ধারাবাহিকতা যেটা বলে, সেটা হলো—যদি আমাদের সময় হয় এই অক্ষে এবং এই অক্ষে যদি আমাদের প্রচেষ্টা হয়, তাহলে বইয়ের ধারাবাহিকতা অর্থাৎ ইতিবাচক সংখ্যা হলো—আমার কোনো প্রচেষ্টার কমতি নেই।
প্রতিদিন রহিম সাত ঘণ্টা পড়ে, পাগলের মতো পড়ে। এটা হলো বইয়ের ধারাবাহিকতা। কিন্তু বাস্তব জীবনের ধারাবাহিকতা কী জিনিস, সেটা বুঝুন। বাস্তব জীবনের ধারাবাহিকতা হলো—আমি প্রতিদিন সাত ঘণ্টা পড়ার চেষ্টা করি, কখনো পারি, কখনো পারি না, কিন্তু কাছাকাছি একটি বেসলাইন দিয়ে যাই।
কখনো কমে গেছে, কখনো বেড়ে গেছে, কিন্তু এই বেসলাইনটা বজায় আছে। কিন্তু আপনার অলস বন্ধু, কাল সকালে দশ ঘণ্টা পড়ল, তার পরের দিন নেই। তারপর আবার চৌদ্দ ঘণ্টা, আবার নেই। তারপর শূন্য। ওর কোনো ধারাবাহিকতা নেই।
সুতরাং, আপনারা ভাবেন যে আপনাকে এরকম একটা অবস্থা থেকে একদম একটা সরল রেখা হয়ে যেতে হবে। জীবনে পারবেন না তো ভাই। বাস্তব জীবনে আপনি প্রতিদিন একই অনুপ্রেরণায় থাকবেন না। বাস্তব জীবনে প্রতিদিন একই পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করবে না। বাস্তব জীবনে প্রতিদিন বাসায় কেউ অসুস্থ হতে পারে, ভাইবোনের বিয়ে হয়ে যেতে পারে, বাপ-মায়ের মধ্যে ঝগড়া হতে পারে, আপনার বন্ধু-বান্ধবীর সাথে ঝগড়া লাগতে পারে।
প্রতিদিন তো একই প্রচেষ্টা দিতে পারবেন না। কিন্তু যদি কোনো দিন আমার রেখাচিত্র কমে যায়, আমার অবশ্যই সেই শক্তি এবং সিদ্ধান্ত থাকতে হবে যে সেই রেখাচিত্রকে উপরে নিয়ে যেতে। অর্থাৎ, পরের দিন প্রথমেই আমি ছয় ঘণ্টা পড়ছি, তারপরের দিন দশ ঘণ্টাতে যাব।
এরকম করে কোনো অবস্থানে নিয়ে আমাকে জিনিসটা ঠিক রাখতে হবে। এটা বসাতে হবে অর্থাৎ প্রতিটা একক মুহূর্তে। আমরা অনুপ্রেরণামূলক ভিডিওতে দেখি যে আমি ফিরে আসছি বিশাল বড় পতনের উপর। না, বিশাল বড় পতন হঠাৎ আসে না।
জীবনে ছোট ছোট পতন আসে। প্রতিদিন আমি যখন আমার ট্র্যাক থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হব, ওই ওদিকে এসে—আচ্ছা, চলুন আবার এদিকে যাই। অর্থাৎ, ট্রেন এদিকে যাবে, আবার ধাক্কা দিয়ে নামতে হবে, আবার এদিকে যাবে, আবার ধাক্কা দিয়ে নামতে হবে। কোনো দিন সরলভাবে ট্র্যাকে থাকবেন না আপনি, এটাই স্বাভাবিক।
এইটা বুঝুন। ভর্তি পরীক্ষার সময় কোন পদ্ধতি অনুসরণ করবেন? কেমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করবেন? বাস্তব জীবনের ধারাবাহিকতা।
আরও পড়ুনঃ ৭ ধরণের স্টুডেন্ট যারা কোনোদিনও পাবলিকে চান্স পায় না!
প্রতিশোধ ও ঘৃণার শক্তি (Revenge and Power of Hate)
এরপর আসি আমরা প্রতিশোধ ও ঘৃণার শক্তি নিয়ে কথা বলি। হা হা হা, আমার প্রিয় বিষয়। বলুন তো পৃথিবীতে মহাযুদ্ধ কয়টা হয়েছে? দুইটা মহাযুদ্ধ? না, আপনি একটু পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটুন।

আপনি গ্রিক ইতিহাস, পারস্য ইতিহাস, তারপরে ইসলামিক ইতিহাস। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগুলো একটু ঘাঁটুন। তখন আপনি উপলব্ধি করবেন যে পৃথিবীতে যুদ্ধ এত সাধারণ। এখন তো তাও যুদ্ধ নেই বললেই চলে। এখন যে যুদ্ধ দেখেন, কিছু না। প্রাচীনকালে মানুষ আরও ভয়াবহ রকম যুদ্ধ করত।
আসে কী থেকে, ভাইয়া? যুদ্ধের মূল কারণ হলো ঘৃণা। আপনি জীবনে, পৃথিবীতে আপনার বাস্তব জীবনেও ভালোবাসার জন্য কয়টা কাহিনী শুনেছেন যে মানুষ ভালোবাসার জন্য পৃথিবী পরিবর্তন করে দিয়েছে? অথচ মানুষ ঘৃণার জন্য যেকোনো চরম পর্যন্ত যেতে পারে। এবং আমি একজন মানুষ হিসেবে যত ভালো সাজতে পারি, আমার অবচেতন মনে, প্রকৌশলী জীবনে তো আমি জানি আপনি ঈর্ষান্বিত।
আমি জানি আপনার জ্বলে। আমি জানি আপনি ওই প্রথম ছেলেটাকে দেখতে পারেন না। আমি জানি আপনার ক্লাসের ওই যে বেশি কথা বলে, তাকে আপনি দেখতে পারেন না। আমি জানি আপনি ওই পরিবারটা যে আপনার বাপ-মাকে এসে কথা শোনায়, তাকে আপনি দেখতে পারেন না।
আমি জানি আপনি সফল মানুষকে দেখতে পারছেন না। আমি আপনাকে চিনি। আচ্ছা, আমিই তো আপনি। ওই আনন্দ একই। সুতরাং, ঘৃণাকে গ্রহণ করুন। ঘৃণা তো আমার জীবনের অংশ। আমি এইটাই বলি। ঘৃণাকে সামনে গ্রহণ করি।
এখন কী সৃষ্টি করব? বিশ্বাসের শক্তি। আজকে থেকে, আজকে থেকে আপনি আপনার ক্লাসের একদম সেরা—মানে ধরুন, সে এনডিসি’র। আবার আপনার শাখায়, আপনার যে শাখায় আপনি ক্লাস করেন, ওই শাখায় দেখবেন এক ছেলে সেরা হয়। তাকে নিয়ে কোচিংয়ের সবাই লাফালাফি, পাগল হয়ে যায়।
এই ছেলেটাকে বা মেয়েটাকে এমন ঘৃণা করবেন, এমন ঘৃণা! এবং এই ঘৃণা কিন্তু ব্যক্তিগত ঘৃণা নয়। এখানে বুঝতে হবে দুই ধরনের ঘৃণা আছে। ব্যক্তিগত ঘৃণা, এটা হলো হিজড়া ঘৃণা। বুঝছেন? একজন মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষতি করা, বিকৃত করা—এটা হিজড়ামি। আপনি সম্পূর্ণ প্রভাব জানেন।
যে আমি তার কোনো ক্ষতি করব না। আমি তার কোনো ক্ষতি করব না। আমি তাকে প্রতিযোগিতা দিয়ে দেখাব, তার জায়গাটা দিয়ে দেখাব কীভাবে। ভাই, কঠোর পরিশ্রম। এই কঠোর পরিশ্রমটা কী দিয়ে চালিত হবে? ঘৃণা দিয়ে।
অর্থাৎ, আমার এই ঘৃণাটা চালিত করবে আমার কঠোর পরিশ্রমকে। যে আমি বুয়েটে চান্স পেতে চাই না। ওই মহিলা আমাকে গত দুটো বছর ধরে আমার মায়ের এতবার কান ভারী করেছেন, আমার পুরো পরিবার ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন। আমাকে বুয়েটে চান্স পেতে হবে। ওই পরিবারের সামনে গিয়ে বলতে চাইতে হবে— “আন্টি, এখন বলেন না, কে চান্স পায় নাই”। এটা আপনাকে পাগল বানিয়ে দেবে।
সম্পূর্ণভাবে প্রতিযোগিতা রাখুন। ব্যক্তিগত ঘৃণা নয়। ব্যক্তিগত ঘৃণা খুব ন্যাক্কারজনক। এটা করবেন না। এটা করে কোনো লাভ নেই। আপনি বড় বড় যোদ্ধাদের দেখবেন যে কখনো নিরস্ত্র কাউকে মারে না।
ধরুন, আরেক রাজাকে ধরা পড়ছে। ওর হাতে একটা তলোয়ার দেয়, এবার দুজন মারামারি করে, তারপর মেরে ফেলে। যে আমি তোকে হারিয়েছি। এটা আমাকে সাহস দেয়। আমি যদি নিরস্ত্র কাউকে মেরে ফেলি, এটা কোনো গ্যারান্টি না। এটা তো কোনো মহত্ত্ব নেই। এটা তো আমার ঘৃণা চালিত হবে না। সুতরাং, প্রতিযোগিতামূলক ঘৃণা এবং প্রতিশোধ শব্দটা ব্যবহার করুন।
আপনারা অনেকে, আমি আপনাদের মধ্যে থেকে দেখি, আপনারা কোমল। আপনারা নিজেদের ক্ষেত্রে কোমল। আমরা দেশের ক্ষেত্রে প্রতিবাদী, আমরা অন্যায়ের ক্ষেত্রে প্রতিবাদী, কিন্তু আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় হলে কোনো প্রতিবাদ করি না। আমাকে মানুষজন সারাটা জীবন অপমান করে গেছে, সারাটা জীবন ছোট করে গেছে।
নিজের পরিবারেও না, অনেক সম্মান ছিল না, পরিবারও গণ্য করে না আমাকে মানুষ হিসেবে। এখন সুযোগ এসেছে জীবন পরিবর্তন করার। আমার কোনো প্রতিশোধের ইচ্ছাই নেই? আমি এতগুলো মানুষের, এতগুলো অপমান—সব ছেড়ে দেব? চিন্তা করুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনি চান ওকে ছেড়ে দিতে? না।
আপনি প্রতিশোধ চান। নিজের গভীর ভেতরের ওই অন্ধকার ঘরটা, অন্ধকার বাক্সটা খুলুন। যেগুলোকে আপনি চেপে দিয়ে রাখছেন, যে আগুনগুলোকে, যে অপমানগুলোকে, যে খারাপ মুহূর্তগুলোকে—খুলে দিন।
অনুভব করুন। প্রতিশোধের উত্তাপ, প্রতিশোধের আগুন অনুভব করুন। তারপর, এই আগুনটা দিয়ে কোন চুলা জ্বলবে? সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পড়বেন। চান্স পাওয়ার জন্য আপনি পড়বেন, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এটি একটি ভিন্ন খেলা। এবং যারা এইটা দিয়ে চালিত হয়, এদেরকে থামানোর কোনো উপায় নেই। বিশ্বাস করুন, শীর্ষের অনুভূতি ভিন্ন।
ক্লান্তি বা অবসাদ (Burnout)
এরপরের বিষয়টি হলো ক্লান্তি বা অবসাদ। আমি যতই আপনাকে অনুপ্রেরণা দেই, যতই যা বলি, আমরা অপরাজেয় নই। আমাদের পায়ের হাড় ভেঙে গেলে আমরা অবশ্যই দৌড়াব না। সুতরাং, আমাদের বাস্তব জীবনে খুব স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক এবং মানসিক ক্লান্তি আসে।
অর্থাৎ আমি যদি একটানা দশ দিন না ঘুমাই, যদি না খেয়ে দিনে দুই-তিন ঘণ্টা করে ঘুমাই, দশ-পনেরো ঘণ্টা করে কাজ করি, একটা সময় আমার মস্তিষ্ক কাজ করবে না। কারণ মস্তিষ্ক ও শরীরের পুনরুদ্ধার দরকার।
ক্লান্তি মানে যখন আমি প্রচণ্ড অনুপ্রাণিত, অনেক পড়তে যাচ্ছি কিন্তু আমি পড়তেছি এবং হয়তো মনে থাকতেছে না, মনোযোগ থাকছে না, ভুলে যাচ্ছি এবং খারাপ লাগছে। মানে কেমন জানি মনে হচ্ছে যে খারাপ লাগছে। খুবই বিষণ্ন করে তোলে। ক্লান্তি এলে কী করতে হবে?
পড়া মোটেই বন্ধ করে দিতে হবে। কতক্ষণের জন্য? সাধারণত এটা আমরা বাহাত্তর ঘণ্টার সময় নেই। যদি সময় কম থাকে, তাহলে এটা চব্বিশ ঘণ্টা হতে পারে। এই চব্বিশ ঘণ্টায় আমি গান গাইতে চাইলে গান গাইব, ছবি আঁকতে চাইলে ছবি আঁকব, নামাজ পড়তে চাইলে নামাজ পড়ব, ভ্রমণে যেতে চাইলে ভ্রমণে যাব, ডেট মারতে চাইলে ডেট মারব।
যা করব, করব। কিছু একটা করব যাতে মস্তিষ্কের উপর চাপ না পড়ে। আর আমাদের ঘুমাতে হবে। না, এই ফোন চালিয়ে ফোন চালাব না, তিন দিন ঘুম। এবং ভালো খাবার খেতে হবে, যাতে আমাদের মস্তিষ্ক পুনরুদ্ধার করে।
তখন দেখবেন, তিন দিন পরে আপনি আবার শক্তিতে ফিরে এসেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনারা আবার কিন্তু চলে যাবেন না। সবকিছু কিন্তু ক্লান্তি নয়। বুঝতে হবে, সবকিছু ক্লান্তি নয়। মাঝে মধ্যে আপনাকে বিরতি নিতে হবে। কিন্তু দেখুন, এর মানে এই নয় যে এখানে পড়তে ইচ্ছা হচ্ছে না, “ভাই আমার মনে ক্লান্তি, আমার মনে ক্লান্তি হয়ে গেছে ভাই আমি একটু তিন দিনের বিরতি নিই”।
আমি জানি এটা এমন একটা স্তরে, যে স্তরে পারবেন না। এটা আপনি নিজে বুঝবেন। দেখুন, আপনারা যখন পড়াশোনাতে ফাঁকি দেন, আপনারা যখন পড়েন না—বলুন তো আপনি কাকে ফাঁকি দিচ্ছেন?
এই জিনিসটা আল্লাহ দেখতেছেন, মহান আল্লাহতায়ালা দেখতেছেন। আপনার বাপ-মা দেখতেছে না, আমিও দেখতেছি না, আপনার শিক্ষক দেখতেছে না, কোচিং দেখতেছে না, কোনো ভাইয়া দেখতেছে না। আপনি দেখতেছেন যে আপনি ফাঁকিবাজ। নিজেকে পরিবর্তন করুন। কোথায় জিতছেন আপনি? কার কাছে জিতছেন বলুন দেখি? সমাজের কাছে জিতে তো লাভ নাই, নিজের কাছে তো হারছেন। বুঝতে হবে।
পমোডোরো টেকনিক ও বিরতি (Pomodoro Technique and Breaks)
এরপরে আসুন, সেটা হলো বিরতি নেওয়ার পমোডোরো কৌশল। সম্বন্ধে তো অনেকে জানেন। এটা আমি আরেকবারও মনে করিয়ে দেই, সেটা হলো—আপনারা এডমিশন টাইমে অনেকে দশ ঘণ্টা, পনেরো ঘণ্টা, চৌদ্দ ঘণ্টা পড়তে বলি আমি।
অনেকে অনেকক্ষণ ধরে বড় বড় ক্লাসগুলো করেন। ক্লাসগুলো করতে গেলে একটা জিনিস বুঝতে হবে। আপনার মস্তিষ্কের এই যে ইচ্ছাশক্তি, এটা যদি একটা বার্গার হয়, এটা মনে করুন আপনার মস্তিষ্ক, এটা হলো আপনার ইচ্ছাশক্তি।
তো মনে রাখবেন, আপনার ইচ্ছাশক্তি হলো একটা ব্যাটারি। ধরুন আপনি সকালে উঠে প্রচণ্ড কঠিন একটা কাজ করছেন, খেতে কোদাল দিয়ে কোপাকুপি করছেন। আপনার যদি আমি বিকেল বেলা পড়তে বলি, আপনি পড়তে পারবেন না। পড়লেও পড়া মনে থাকবে না। কেন?
কারণ আপনি ওই ক্ষেতে কোদাল কোপাকুপি করার পরে আপনার একটা খুব কঠিন, অপছন্দনীয় কাজ করছেন। আপনার মস্তিষ্ক এখানে বিশ্রাম নিচ্ছে। তারপরও ধরুন, আমি আপনাকে পাঠিয়ে দিলাম বন্ধু, চলুন জিমে যাই। তারপরে ইচ্ছাশক্তি নেমে আসছে আরও এইখানে।
এরপরে আপনি কী করছেন? আপনি এবার তারপরে আরও চার ঘণ্টা ধরে ফোন চালিয়েছেন। এবার আপনার ইচ্ছাশক্তি নেমে আসছে আরও নিচে। আপনি কী করছেন এখন? আপনি পড়তে বসেছেন, আপনার ইচ্ছাশক্তি বাকি নাই। সুতরাং, ইচ্ছাশক্তিকে বারবার রিচার্জ করতে হবে।
কিন্তু একটা ভালো ব্যাপার হলো—এটা রিচার্জ হতে পারে। রিচার্জের জন্য, রিচার্জ, রিচার্জ। ঘুম। ঘুম মানে প্রতিবার নয় ঘণ্টা ঘুম না। এই নতুন একটা জিনিস অনুশীলন করবেন। এটা নিয়ে ভিডিও দেখতে পারেন অনলাইনে। খুব কাজের জিনিস পাওয়ার ন্যাপ অথবা সম্পূর্ণ বিশ্রাম। অর্থাৎ আমি ঘুমাব না।
রুমের লাইট, ফ্যান সব অফ করে একদম চুপচাপ শুয়ে থাকব, ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নেব। এগুলো দিয়ে আমি ইচ্ছাশক্তিকে আরেকবার রিচার্জ করব। পমোডোরো কৌশল বলে যে আমি একসাথে কখনোই দশ ঘণ্টা পড়ব না। আমি এক ঘণ্টা পড়ব, দশ মিনিট বিরতি। আবার এক ঘণ্টা পড়ব, দশ মিনিট বিরতি।
আবার এক ঘণ্টা পড়ব, দশ মিনিট বিরতি। এরকম করে বিরতি দিয়ে দিয়ে যখন আমি পড়ব, তখন অনেকক্ষণ পড়তে পারব। আর যদি এমন হয়, আমি একটানা পনেরো ঘণ্টা পড়তেছি, আমার রেখাচিত্রটা একদম মোট নিচের দিকে নেমে আসবে। প্রথম এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা খুব পড়ব। শেষের দুই ঘণ্টা কী পড়ব ভাই?
“তুই ক্লাসটা শেষ কর ভাই, প্লিজ”—এরকম একটা অবস্থা হয়ে যায়। Add a Photo Here
শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাওয়া
ঠিক আছে, এবার আসুন। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাওয়া। এবং মৃত্যু ব্যতীত আমাকে থামায় কে—এই লাইনটা মনে রাখবেন। খুবই শক্তিশালী একটা লাইন। এডমিশন সময়টাতে আমরা যে একটা খুবই সীমাহীন প্রতিযোগিতায় নেমেছি, সেটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন।
আমাদের এইচএসসি পরীক্ষা দেয় গড়ে দশ লাখ মানুষজন। এই দশ লাখ মানুষজনের মধ্যে পাঁচ লাখ হলো কলা বিভাগের মানুষ। দুই দশমিক পাঁচ লাখ হলো বিজ্ঞান বিভাগের মানুষ। এক দশমিক দুই লাখ হলো বাণিজ্য বিভাগের মানুষ। এই তিনটা তো আমরা জানি।
কিন্তু চূড়ান্তভাবে, দশ লাখ মানুষ কী করতে চায়? প্রত্যেকটা শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। ভাইয়া, সবচেয়ে পরিহাসের বিষয়—সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার। মেডিকেলের ক্ষেত্রে আরও কম।
তাও ধরে নিলাম যে চল্লিশ হাজার, তো ধরে নিলাম আপনার হিসাবের সুবিধার জন্য পঞ্চাশ হাজার আসন। পঞ্চাশ হাজার আছে ধরে নিলাম। হিসাবের সুবিধার জন্য, যদিও আসলে আরও অনেক কম।
তার মানে নয় লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষজন জীবনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে না। পরিহাস! পরিহাস এটাই তো। পরিহাস মানে কী? একটা জঘন্য রকম প্রতিযোগিতায় আমি নেমেছি, যেখানে আমার চান্স পাওয়ার হারটা একটু হিসাব করে দেখি। পঞ্চাশ ভাগ দশ লাখ সমান শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য পাঁচ। শতকরার হিসাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার হার শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ।
বুয়েটে গড়ে একজন মানুষের চান্স পাওয়ার হার হয় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ। মেডিকেলের ক্ষেত্রে এটা এক শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা দুই শতাংশ। যে শীর্ষ তিনটা প্রতিষ্ঠান, গোটা বাংলাদেশের—সবাই স্বপ্ন দেখে পড়ার জন্য। অনেকে বলতে পারে ভাইয়া, সিকিউরিটি বিশ্লেষণ আপনি করেন না কেন?
কারণ সিকিউরিটির আসন সংখ্যা আমি জানি না। আমাকে যদি কেউ মন্তব্যে জানায়, আমি এরপর থেকে সম্পূর্ণ গণনা করে বলব। যাও। এই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দেশের কদাচিৎ তিন শতাংশ মানুষজন পড়তেছে। তার মানে বাকি সাতানব্বই শতাংশ মানুষজন, সাতানব্বই শতাংশ মানুষজন এটার বারান্দাতেও যাবে না। শিক্ষার্থী হিসেবে।
ঘুরতে যেতে পারে। তার মানে আপনি এমন একটা জঘন্য প্রতিযোগিতায় ঢুকতেছেন, যেখানে প্রত্যেকেই জীবন নিয়ে খেলতেছে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই এই আসনটার জন্য যেকোনো চরম পর্যন্ত যেতে পারবে। এমন মানুষজন আছে যারা সতেরো ঘণ্টা, বিশ ঘণ্টা, চব্বিশ ঘণ্টা পড়বে, চান্স পাবে না। আবার এমন অনেক মানুষজন আছে, দুই-চার ঘণ্টা পড়েও, কিচ্ছু না পড়েও চান্স পাবে।
বেশিরভাগ অংশটা দেখুন। এখন আমরা শিখব আরেকটা পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ। যারা পরিসংখ্যান নিয়ে পড়বেন, এই কারণটা পড়তে পড়তে জীবনটা সার্থক হয়ে যাবে। এটাকে আমরা সংক্ষেপে বেল কার্ভ বলতে পারি। এখানে আপনারা বিভিন্ন রকম বন্টন পড়বেন—গাউসীয় বন্টন, ইউক্লিড বন্টন, পয়সন বন্টন, অনেক কিছু। ওর মূল কথা হলো গ্রাফটার দিকে তাকান।

গ্রাফের দুই দিকে দুইটা ব্যতিক্রমী দল থাকে। এই দিকে একটা দল থাকে, আর এই দিকে আরেকটা দল থাকে। এই দলটা হলো আমাদের খুবই নিম্নস্তরের শিক্ষার্থীরা। অর্থাৎ এরা পাস করেও পায় না, টেনেটুনে পাস করেও না, মেধাও না—এরকম নিম্নস্তরের শিক্ষার্থীরা। এই দিকের দলটা হলো সেরা।
অর্থাৎ এরা হলো বুয়েটের শীর্ষ দশ, ঢাবির শীর্ষ দশ, শীর্ষ একশো, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক থেকে একশো। এগুলো হলো সেরা। আমাদের মাঝপথে আছি আপনি, আমি, আমরা সবাই। অর্থাৎ আমরা আছি এই জায়গায়। আমরা হলাম মধ্যম মানের। Add a Photo Here
এবং মনে রাখতে হবে, এদের মধ্যে কেউ চান্স পাবে না, কেউ খুব কম পরিশ্রমে চান্স পাবে। কিন্তু এখানে চান্স পেতে গেলে চরম কঠোর পরিশ্রম করা লাগবে। অর্থাৎ জঘন্য রকমের পরিশ্রম।
আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলি, আপনার কথায় বিশ্বাস না হলে গিয়ে বুয়েট, কুয়েট যেখানেই পরিচিত ভাইয়া আছে, সবাইকে জিজ্ঞাসা করুন— “আপনি কি চান্স পেয়েছিলেন, কতটুকু পড়তেন, আপনার মনোভাব কেমন ছিল পড়ার প্রতি, খুব পরিশ্রম করেছেন কি না”?
যারা কঠোর পরিশ্রম করেছে, তারা বলবে না যে এই দশ শতাংশ এরা প্রকৃত প্রতিভা, প্রাকৃতিকভাবে প্রতিভাবান। আবার ভাইয়া, আমি মানুষকে চিনি—ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিং করেছে, মেডিকেলের বই হাতেও দেয় নাই, বাইরে জীবন যাপন করছিল।
একদিন মেডিকেল পরীক্ষার আগে পড়ে, ডিএমসি তে চান্স পেয়ে বসে আছে। কিন্তু ডিএমসি-তে আপনি দুশো জন ছেলে-মেয়েকে ডাকুন তো, বলবে— “ভাই, পাগলের মতো পড়েছি ভাই। দুই বছর ধরে মরেই গিয়েছিলাম পড়তে পড়তে”।
আরও পড়ুনঃ ইউনিভার্সিটি ভর্তি সিজনে মনোবল ধরে রাখার কৌশল!
এই দলটাতে যখন আপনি থাকবেন, আপনার এই মানসিকতা থাকতে হবে যে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মিসবিউপি, এমআইএসটি, আইইউডি, তারপর হলো জিএসটি, এইচএসটি, কৃষি গুচ্ছ, যা আছে সব পরীক্ষা দিতে হবে। যতদিন পর্যন্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা আসন না পাই, আমি পরীক্ষা দিয়ে যাব। যদি আপনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান।
এখন তো মানুষের অনেক টাকা, ভাই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনারা বিশ-পঁচিশ লাখ টাকা দিয়ে পড়তে পারেন। আমার বাবার কাছে বিশ হাজার টাকা চাইলে, মনে করুন। আপনাদের বাপ মা অনেক ভালো।
কিন্তু যদি আপনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, আপনার এই স্তরটা প্রয়োজন। ভাইয়া, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটাকে এত মহিমান্বিত কেন করি? সত্য কথা, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে কিছুই হয় না, আবার সবকিছুই হয়।
বুঝতে হবে, আমরা বাঙালি—অনেক গরিব। আপনার যদি মনে হয় আপনার পরিবার, আপনার প্রতি মাসে ত্রিশ হাজার টাকা করে সেমিস্টার ফি দিতে পারবে, মিনিমাম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার টাকা। তো ধরে নিলাম, বেশ হলো—ত্রিশ হাজার মানে মোটামুটি। খেয়ে পরে সেমিস্টার ফি দিয়ে থাকতে হয়।
কম আয়ে যদি আপনি যান, আপনার পরিবারকে আপনাকে প্রতি মাসের ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে এডমিশনের পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পালন করতে হবে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ পরিবারের মাসিক আয় ত্রিশ হাজার টাকা। এটা দিয়ে পাঁচজন চলে। এটা দিয়ে আপনি পড়তে যান কোন লজ্জায়?
এইজন্যই আমি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে মহিমান্বিত করি। দ্রুততা, ভালোবাসা, টাকা—আমরা গরিব, টাকা নাই ভাই। কোথায় ভর্তি হবেন আপনি? এত টাকা আছে আপনার কাছে? আপনার বাপ প্রতি মাসে ত্রিশ হাজার টাকা দিবে? তাহলে ওরা খাবে কী? এই জন্য বলেছি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে হবে।
এই জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এত মাতামাতি। সরকারি-বেসরকারি নিয়ে বিতর্ক কেন হয়? বিতর্ক ওই শীর্ষ এক শতাংশের জন্য তো হবে না—ধনীর ছেলে বুয়েটে পড়তেছে, তার তো কোনো সমস্যা নাই। সে চাইলে যেকোনো জায়গায় পড়তে পারত।
কিন্তু যে শ্রমিকের সন্তান, যার মা-বাপের দুজনের মজুরি যোগ করে দিনে আসে তিনশো টাকা, সেই সন্তান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে—সে কখনো সরকারি-বেসরকারি বিতর্কে যাবে না। সে জানে, আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না হলে আমার পুরো পরিবারটা পড়ে যেত। এই পুরো পরিবারকে টেনে তুলব আমি।
এইজন্য বলা হয়, এখানে আপনাকে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যেতে হবে। আপনার অনুপ্রেরণা থাকবে মৃত্যু ব্যতীত। থামায় কে? আপনাকে থামানোর ক্ষমতা শুধুমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার। এবং ওই রকম শক্তি ও পরিশ্রম নিয়ে এডমিশন সময়টাকে মোকাবেলা করতে হবে। ইউটিউবে আনফ্রিজ চান্স পায় নাই। একবার, আরেকবার, আরেকবার, ক্রমাগতভাবে।
এবং এই পরিমাণে অনুপ্রাণিত হয়ে ও আবিষ্ট হয়ে যদি আপনি এগিয়ে যান, ইনশাআল্লাহ একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার আসন হবে। সুতরাং, এইটাই ছিল আজকের সম্পূর্ণ মানসিক সেশন। আমি চেষ্টা করেছি যতগুলো এডমিশন টাইমে আপনি ফেস করবেন, সবকিছু কভার করতে।


1 Comment
Pingback: ৭ ধরণের স্টুডেন্ট যারা কোনোদিনও পাবলিকে চান্স পায় না! - Why 7 Types of Student Never Get Chance in Public University! - NiceTrix